বাজেটে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ ফিরছে? অর্থনীতি চাঙ্গা করতে নতুন ভাবনা সরকারের
দেশের অর্থনীতি বর্তমানে বহুমুখী চাপে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগে স্থবিরতার মধ্যে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে নতুন পরিকল্পনা করছে সরকার। অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বা ‘কালো টাকা’ বিনিয়োগের সুযোগ আবারও সহজ করার বিষয়ে আলোচনা চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দেশে প্রতিবছর প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়। এই অর্থ দেশে ফিরিয়ে এনে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানমুখী খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতেই সরকার নতুন উদ্যোগ বিবেচনা করছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আবাসন খাত, শিল্প খাত এবং পুঁজিবাজারে নির্দিষ্ট হারে কর দিয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হতে পারে। আলোচনায় রয়েছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কর দিয়ে এই অর্থ বৈধ করার প্রস্তাব। একই সঙ্গে অর্থের উৎস নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো প্রশ্ন না তোলার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে উত্তরণে সীমিত পরিসরে এই সুবিধা কার্যকর হতে পারে। তাদের মতে, বিদেশে পাচারের বদলে অপ্রদর্শিত অর্থ দেশের অর্থনীতিতে ফিরলে বিনিয়োগ বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
রিহ্যাব সভাপতি ড. মো. আলী আফজাল বলেন, “বিনা শর্তে এই সুযোগ দিলে আবাসন খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ আসবে। আবাসন খাতের সঙ্গে প্রায় ২৫০টি সাব-সেক্টর জড়িত। এতে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান বাড়তে পারে।”
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজও মনে করেন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে কর সুবিধা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তিনি দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল নীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অন্যদিকে সমালোচকরারা বলছেন, বারবার কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিলে নিয়মিত করদাতারা নিরুৎসাহিত হন এবং করনৈতিক শৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এনবিআরের কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থানের কথা জানিয়েছেন।
বর্তমান আয়কর আইনেও অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ রয়েছে। তবে অতীতে অনেক বিনিয়োগকারী দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা অন্যান্য সংস্থার তদন্তের আশঙ্কায় এই সুবিধা নিতে আগ্রহী হননি। এবার সেই দায়মুক্তির বিধান ফিরিয়ে আনার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
২০২০-২১ অর্থবছরে বিশেষ সুবিধার আওতায় প্রায় ২০ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা কালো টাকা বৈধ করা হয়েছিল, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ওই সময় সরকার প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আয় করেছিল।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ডলার সংকট এবং রাজস্ব ঘাটতির মধ্যে অর্থনীতিকে সচল রাখতে বিকল্প পথ খুঁজতে হচ্ছে সরকারকে। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর আপত্তির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
আগামী ১১ জুন নতুন সরকারের প্রথম বাজেট ঘোষণা হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ কতটা থাকবে, কোন খাতে সুবিধা দেওয়া হবে এবং করহার কত নির্ধারণ করা হবে—তা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর জানা যাবে।
মন্তব্য করুন