বাংলাদেশে জঙ্গি ও উগ্রবাদী শক্তির উত্থানের কারণে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়কার “অন্ধকার দিনগুলো” আবার ফিরে আসতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ভারতের গণমাধ্যম Hindustan Times-কে দেওয়া এক ই-মেইল সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দেশে জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের বিস্তার শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠছে। ()
বর্তমানে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে নিষিদ্ধ এবং শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। ২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি ভারতেই অবস্থান নেন। সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, খুব শিগগিরই বাংলাদেশে ফিরবেন, তবে তার ফেরা নির্ভর করছে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ, রাজনৈতিক অধিকার এবং আইনের শাসন ফিরে আসার ওপর। ()
‘আমার অনুপস্থিতি মানে নীরবতা নয়’
শেখ হাসিনা বলেন, “১৭ মে আমার জন্য অত্যন্ত আবেগঘন একটি দিন। ১৯৮১ সালের এই দিনে ছয় বছরের নির্বাসন শেষে আমি দেশে ফিরেছিলাম। তখনও আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, মামলা ও জীবনের ঝুঁকি ছিল।”
তিনি আরও বলেন, “আমার অনুপস্থিতি মানে আমার নীরবতা নয়। আমি প্রতিনিয়ত দেশের জন্য কাজ করছি এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও আইনি পরিসরে সক্রিয় আছি।”
নিজের বিরুদ্ধে একাধিক হামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “আমি ১৯টি হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে গেছি। কিছুই আমাকে থামাতে পারেনি। আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তাই খুব শিগগিরই বাংলাদেশের মাটিতে ফিরব।”
আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে যা বললেন
আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “আওয়ামী লীগ জনগণের দল। কাগজে লেখা কোনো নিষেধাজ্ঞা এই দলকে দমন করতে পারবে না।”
তার দাবি, আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে ভয় পেয়েই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “যদি আওয়ামী লীগ সংগঠিতভাবে গণতান্ত্রিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে, তাহলে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়া কঠিন হবে বলেই তারা ভয় পাচ্ছে।”
তিনি আরও দাবি করেন, হামলা-মামলা ও নির্যাতনের পরও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ রয়েছেন এবং দলের প্রত্যাবর্তন “শুধু সময়ের ব্যাপার”।
‘নেতারা স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়েননি’
দেশ ছেড়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ নেতাদের বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, তারা স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়েননি। তার অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, “প্রায় ৬০০ নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে এবং দেড় লাখের বেশি নেতা-কর্মীকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”
অর্থনীতি নিয়ে সমালোচনা
বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকারের সময় বাংলাদেশ শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছিল। তিনি পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেন।
তার অভিযোগ, বর্তমান সরকারের সময়ে অর্থনীতি ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। তিনি বলেন, “বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই, তেল নেই, সার নেই। কর্মসংস্থান কমেছে এবং পণ্যের দাম বেড়েছে।”
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, “ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান অনস্বীকার্য।”
তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে একটি গোষ্ঠী রাজনৈতিকভাবে ভারতবিরোধী বক্তব্য ব্যবহার করে আসছে এবং সাম্প্রতিক সময়েও সেই প্রবণতা বেড়েছে।
জঙ্গিবাদ নিয়ে সতর্কবার্তা
শেখ হাসিনা বলেন, ২০০১-০৬ সালের বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময় বাংলাদেশ জঙ্গিবাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছিল। সে সময় দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলা, গ্রেনেড হামলা এবং অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানের ঘটনা ঘটেছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তার দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আবারও জঙ্গিবাদের বিস্তার বেড়েছে এবং দণ্ডিত জঙ্গিদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, “২০০১-০৬ সালের অন্ধকার দিনগুলো আবার ফিরে আসার উপক্রম হয়েছে।” সূত্র: Hindustan Times
মন্তব্য করুন