এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে ১৫০ রুপি বিনিময় হার শুধু একটি সংখ্যা নয়, বরং সম্ভাব্য গভীর অর্থনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত হতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। এ নিয়ে সম্প্রতি অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও বিজ নিউজ প্লাসের প্রতিষ্ঠাতা জয়ন্ত মুন্ধরা–র একটি মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ভাইরাল হওয়া এক পডকাস্টে তিনি বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট আরও গভীর হলে ভারতীয় রুপি বড় ধরনের চাপে পড়তে পারে। তার এই মন্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্বেগ, সমালোচনা এবং নানা ধরনের মিম ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিও এ ধরনের আশঙ্কাকে উসকে দিচ্ছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ছে। একই সঙ্গে শক্তিশালী হচ্ছে মার্কিন ডলার, বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডের সুদহার এবং উদীয়মান বাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সতর্কতা।
ভারত তাদের প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের বড় অংশ আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে দেশটির আমদানি ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। এতে ডলারের চাহিদা বাড়ে এবং ভারতীয় রুপির ওপর চাপ তৈরি হয়।
জয়ন্ত মুন্ধরার মতে, আমদানিনির্ভর জ্বালানি, প্রযুক্তি অবকাঠামো, ইলেকট্রনিকস এবং বিদেশি মূলধনের ওপর ভারতের নির্ভরতা রুপিকে বৈশ্বিক ধাক্কার মুখে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে তেলের উচ্চ মূল্য এবং বিনিয়োগকারীদের ডলারমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকলে রুপির অবমূল্যায়ন ঠেকানো কঠিন হতে পারে।
তবে সাবেক আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল–এর উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গীতা গোপীনাথ সম্প্রতি বলেছেন, ডলারের বিপরীতে রুপি ১০০ ছুঁলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থনৈতিক বিপর্যয় বোঝায় না। তার মতে, বৈশ্বিক ডলার আধিপত্য এবং উচ্চ তেলের দামের বাস্তবতায় শুধু বিনিময় হার দিয়ে অর্থনীতির শক্তি বিচার করা উচিত নয়।
অন্যদিকে, চয়েস ব্রোকিংয়ের পণ্য বিশ্লেষক কাবেরী মোরে বলেন, ডলারের বিপরীতে রুপি ১৫০–এ পৌঁছানো প্রযুক্তিগতভাবে অসম্ভব নয়, তবে এর জন্য চরম বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় প্রয়োজন হবে।
তিনি বলেন, “১৫০ রুপিতে পৌঁছানো সম্ভব, তবে সেটি হবে অত্যন্ত ব্যতিক্রমধর্মী পরিস্থিতি। নিকট ভবিষ্যতের বাস্তবসম্মত পূর্বাভাস নয়, যদি না বৈশ্বিক ধাক্কা পদ্ধতিগত সংকটে পরিণত হয়।”
বিশ্লেষকদের মতে, রুপিকে ১৫০–এ ঠেলে দিতে একসঙ্গে একাধিক সংকট তৈরি হতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট, তেলের উচ্চ মূল্য, বিদেশি বিনিয়োগের বহির্গমন, মার্কিন বন্ডের উচ্চ সুদহার, রফতানি প্রতিযোগিতা কমে যাওয়া এবং উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর ওপর একযোগে চাপ সৃষ্টি হওয়া।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা। তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় ও চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়ে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ সুদহার বিদেশি বিনিয়োগকে উদীয়মান বাজার থেকে সরিয়ে ডলারভিত্তিক সম্পদের দিকে নিয়ে যায়, যা রুপির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
মন্তব্য করুন