নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট প্রস্তুত করছে বিএনপি সরকার। সম্ভাব্য বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে বাজেট বাড়ছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর পর বিএনপি একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে। আগামী বাজেটে সেই অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের প্রতিফলন থাকবে।
তবে বড় বাজেটের পাশাপাশি সরকারকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে রাজস্ব সংকট, ঋণনির্ভরতা এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনার কঠিন চ্যালেঞ্জ। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী বাজেটে মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে সম্ভাব্য ঘাটতি দাঁড়াবে ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
এই ঘাটতি মেটাতে সরকারকে দেশি ও বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাত সংস্কার এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপও সামলাতে হবে।
সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থসচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যানকে নিয়ে বাজেট সংক্রান্ত বৈঠক করেছেন। সেখানে তরুণ উদ্যোক্তা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আগামী বাজেটে শুধু সুদ পরিশোধেই ব্যয় হতে পারে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। দেশি-বিদেশি ঋণ দ্রুত বাড়ায় এটি সরকারের সবচেয়ে বড় চাপের জায়গা হয়ে উঠেছে।
কর কাঠামোয়ও কিছু পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হতে পারে। তবে মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশার ওপর অগ্রিম আয়কর আরোপের চিন্তাও করছে সরকার। একই সঙ্গে ভ্যাট অব্যাহতির তালিকা ছোট করার আলোচনা চলছে।
আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকারও রেকর্ড ৩ লাখ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার মনে করছে, উন্নয়ন ব্যয় বাড়ালে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়বে। তবে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে বড় বাজেট কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতেও ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নগদ সহায়তা কর্মসূচির আওতা বাড়তে পারে।
এদিকে মূল্যস্ফীতি এখনো বড় উদ্বেগের কারণ। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৮ শতাংশের বেশি। আগামী বাজেটে তা সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য থাকতে পারে। তবে চাল, ডাল, তেল, চিনি, মাছ ও মাংসের উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ মানুষ এখনো চাপে রয়েছে।
সরকার শিল্প ও বিনিয়োগে গতি ফেরাতে কিছু খাতে কর ছাড়, শুল্ক সুবিধা ও পুনঃতফসিল নীতিতে শিথিলতার কথাও ভাবছে। পাশাপাশি বন্ধ সরকারি কারখানা চালুর জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির ভিত্তিতে নতুন বিনিয়োগ কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী বাজেট হবে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের চাপ—এই তিনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার বড় পরীক্ষা।
মন্তব্য করুন