আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনা, ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং খাদ্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে একগুচ্ছ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২৪ জুন) জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত লিখিত প্রশ্নোত্তর পর্বে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এসব তথ্য জানান।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে দেশের মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছিল। সেই অবস্থান থেকে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার সরকারি লক্ষ্যকে অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. ফজলে হুদার এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, “দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষা এবং অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নকে বর্তমান সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেছে।”
তিনি জানান, মূল্যস্ফীতি কমাতে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির কার্যকর সমন্বয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ, বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ, অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তায় ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা
সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষায় আগামী অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় ৪১ লাখ নারীকে মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা দিতে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া কৃষক কার্ড কর্মসূচির আওতায় দেশের ১০০টি উপজেলায় ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করে ১ হাজার ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, “মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর হাতে সরাসরি সহায়তা পৌঁছে দিয়ে তাদের ভোগক্ষমতা ও জীবিকা সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এসব কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য।”
খাদ্য নিরাপত্তায় বহুমুখী উদ্যোগ
খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি জানান, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় বর্তমানে ৫৫ লাখ উপকারভোগী পরিবারকে কর্মাভাবকালীন ছয় মাস ১৫ টাকা কেজি দরে প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে চাল সরবরাহ করা হচ্ছে।
এ ছাড়া সারাদেশে এক হাজারের বেশি বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে ভর্তুকিমূল্যে চাল ও আটা বিক্রি অব্যাহত রয়েছে। চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে ৪১৯টি উপজেলায় অতিরিক্ত ওএমএস কার্যক্রম চালু করা হয়েছে, যেখানে প্রতি কেজি চাল ৩০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।
সরকারি খাদ্যশস্য ধারণক্ষমতা ২৩ লাখ ১৬ হাজার মেট্রিক টন থেকে বাড়িয়ে ২৪ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রাও ৩৮ লাখ ১৯ হাজার মেট্রিক টন থেকে বাড়িয়ে ৪১ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টনে উন্নীত করা হবে।
উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নে বিশেষ পরিকল্পনা
অর্থমন্ত্রী বলেন, উত্তরাঞ্চলের অবহেলিত ও অনুন্নত এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
যদিও উত্তরাঞ্চলের জন্য আলাদা কোনো অঙ্কভিত্তিক বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়নি, তবে সামগ্রিকভাবে ভৌত অবকাঠামো খাতে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় উত্তরাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, কোল্ড-চেইন অবকাঠামো, সংরক্ষণাগার, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প এবং লজিস্টিকস উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির লক্ষ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছে।
সরকারের আশাবাদ
বক্তব্যের শেষাংশে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “সরকার মনে করে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সহায়তা, খাদ্যনিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক অবকাঠামো উন্নয়নে সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।”
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি কমানো এবং প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর লক্ষ্য অর্জন করতে হলে উৎপাদন বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তা হলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে।
মন্তব্য করুন