sayed
৬ অগাস্ট ২০২৬, ১২:৩৯ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

দেশে ফিরেই জনগণের পাশে দাঁড়াতে চাই: বিদেশি সাংবাদিকদের সামনে শেখ হাসিনা

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কথা না ভেবে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বাংলাদেশে ফিরতে চান। বুধবার (৫ আগস্ট) দক্ষিণ এশিয়ার ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (Foreign Correspondents’ Club of South Asia) আয়োজিত এক ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

বক্তব্যের শুরুতে তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ৩০ লাখ মানুষ এবং ১৫ আগস্টে নিহত পরিবারের সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। একই সঙ্গে তাঁর ভাই শেখ কামালের জন্মদিন স্মরণ করে তাকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে উল্লেখ করেন।

শেখ হাসিনা দাবি করেন, গত দুই বছরে বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর ভাষায়, দেশের মানুষ ভয়, অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে জীবনযাপন করছে।

জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর আন্দোলনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি কেবল একটি শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন ছিল না। তাঁর দাবি, সরকার শুরু থেকেই সংলাপ ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছিল। কোটা সংস্কার নিয়ে শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষাপটে সরকার আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছিল এবং প্রয়োজন হলে আইন করে স্থায়ী সমাধানের আশ্বাসও দিয়েছিল। তবে তাঁর অভিযোগ, আন্দোলনকে পরবর্তীতে সংগঠিত সহিংসতা ও সরকার পরিবর্তনের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া হয়।

তিনি আরও দাবি করেন, আন্দোলনের সময় দেশজুড়ে সরকারি স্থাপনা, গণপরিবহন, পুলিশ স্টেশন, কারাগার, গণমাধ্যমের কার্যালয় ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কার্যালয়ে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালানো হয়। একই সঙ্গে পুলিশ সদস্য, সাংবাদিক এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী হত্যার ঘটনাও ঘটে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকার পক্ষে অবস্থান নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, রাষ্ট্রের সম্পদ, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা রক্ষা করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাংবিধানিক দায়িত্ব। তিনি বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের পদক্ষেপকে অপরাধ হিসেবে দেখানো উচিত নয়।

তিনি জানান, ১৮ জুলাই বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছিল এবং পরে সেটিকে তিন সদস্যের কমিশনে উন্নীত করা হয়। তাঁর অভিযোগ, ক্ষমতার পরিবর্তনের পর সেই তদন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং প্রকৃত সত্য প্রকাশের সুযোগ নষ্ট করা হয়।

বর্তমান ও অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করে শেখ হাসিনা দাবি করেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মামলা, গ্রেপ্তার, গুম, নির্যাতন ও রাজনৈতিক হয়রানি চলছে। তাঁর অভিযোগ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, সাংবাদিক, আইনজীবী, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়ি ধ্বংস এবং যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের মুক্তির বিষয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমান সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমেছে, শিল্পখাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে, খেলাপি ঋণ বেড়েছে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমেছে এবং বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। তাঁর দাবি, দারিদ্র্য ও বেকারত্বও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

নিজ সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরে তিনি পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কর্ণফুলী টানেল ও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটসহ বিভিন্ন প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, তাঁর সরকারের সময় দারিদ্র্য কমেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিস্তার ঘটেছে এবং বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে উন্নয়নের উদাহরণ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল।

রোহিঙ্গা সংকটের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছিল।

তরুণদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, প্রতিবাদ করার অধিকার তাদের রয়েছে, তবে কোনো গোষ্ঠীর রাজনৈতিক স্বার্থে নিজেদের ব্যবহার হতে দেওয়া উচিত নয়। তিনি তরুণদের জ্ঞান, প্রযুক্তি ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে দেশ গড়ার আহ্বান জানান।

জাতীয় পুনর্মিলনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুনর্মিলন মানে অপরাধের দায়মুক্তি নয়; বরং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের প্রশ্নে বিশ্বের বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সমর্থন প্রয়োজন।

বক্তব্যের শেষ অংশে তিনি আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবি জানান।

সবশেষে শেখ হাসিনা বলেন, দেশে ফিরে তাঁকে গ্রেপ্তার বা কারাবন্দি করা হলেও তিনি জনগণের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবেন না। তাঁর ভাষায়, ব্যক্তিগত ক্ষমতার জন্য নয়, বরং বাংলাদেশকে উন্নয়ন, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও স্থিতিশীলতার পথে ফিরিয়ে আনতেই তিনি দেশে ফিরতে চান।

বক্তব্যের সমাপ্তিতে তিনি বলেন, “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।”

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দেশে ফিরেই জনগণের পাশে দাঁড়াতে চাই: বিদেশি সাংবাদিকদের সামনে শেখ হাসিনা

সার্জিও গোরের সফরে হঠাৎ পরিবর্তন, বাতিল নৈশভোজ: কূটনৈতিক মহলে নানা জল্পনা

কমিটি বিলুপ্তির ঘোষণা, সিভি আহ্বান: মীরসরাইয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ফরমায়েশি রায় ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সমাবেশ

শিখা অনির্বাণের চিরন্তন শিখা নিভে থাকার তথ্য ঘিরে নতুন প্রশ্ন

ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় বড় পদক্ষেপ সামাজিক নিরাপত্তা ও খাদ্য সহায়তায় রেকর্ড বরাদ্দ

কারখানা বন্ধে উদ্বেগ, রেমিট্যান্সে বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার

একনেকে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়নসহ ৫ প্রকল্প অনুমোদন

দুবাইয়ে আটক বেনজীর আহমেদকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে

দিল্লি বিমানবন্দরে আটকা পড়লেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা :ধরলেন ফিরতি ফ্লাইট

১০

বাংলাদেশিদের টার্গেট করে পাকিস্তান-সংশ্লিষ্ট অঙ্গ পাচার চক্রের অভিযোগ

১১

‘থানা পুড়িয়ে দিয়েছি’ বলে আলোচনায় আসা সন্ত্রাসী, ধাওয়ার অভিযোগ তুলে থানায় আশ্রয়

১২

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক দখল করে ব্যাপক সংঘর্ষ

১৩

স্ট্রিট লাইটিংয়ের নতুন প্রযুক্তি শিখতে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা

১৪

বিশ্ব-দানবের মুখোশ খুললেন জয়শঙ্কর

১৫

সংসদে তোফায়েল আহমেদসহ বিশিষ্টজনদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ

১৬

সরকারের প্রথম ১০০ দিনে ৬০৫ খুন, ২০৯ ধর্ষণ: টিআইবি

১৭

৭ জুনকে কেন্দ্র করে মাঠে বাড়তি নজরদারি সম্ভাব্য ঝটিকা মিছিলের আশঙ্কায় জেলা পুলিশকে সতর্কবার্তা

১৮

ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা: বাঙালির মুক্তিযাত্রার স্মরণীয় দিন

১৯

সংকটে ব্যাংক খাত, তবু সেখানেই সরকারের ভরসা

২০