আদানি শিল্পগোষ্ঠীকে ঘিরে আন্তর্জাতিক বিতর্ক এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভূমিকা নিয়ে মন্তব্য করার পর ফের ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনের কেন্দ্রে উঠে এসেছেন হাঙ্গেরিয়ান বংশোদ্ভূত মার্কিন ধনকুবের জর্জ সোরোস। এবার তাঁকে সরাসরি নিশানা করলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস. জয়শঙ্কর।
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এক বৈঠকের পর জয়শঙ্কর সোরোসকে কটাক্ষ করে বলেন, তিনি একজন “বয়স্ক, ধনী এবং একগুঁয়ে ব্যক্তি”, যিনি এখনও বিশ্বাস করেন যে তাঁর মতামত অনুযায়ী বিশ্ব পরিচালিত হওয়া উচিত। জয়শঙ্করের মতে, এ ধরনের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন এবং বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দিতে চান।
আদানি বিতর্ক থেকে নতুন সংঘাত
বিতর্কের সূত্রপাত মূলত আদানি গোষ্ঠীকে ঘিরে। মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিন্ডেনবার্গ রিসার্চের প্রতিবেদনে গৌতম আদানির ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে শেয়ারবাজারে কারসাজির অভিযোগ ওঠার পর সোরোস প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলেন, কেন প্রধানমন্ত্রী মোদী এ বিষয়ে নীরব।
জার্মানির মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে সোরোস বলেন, ভারতের মতো একটি গণতান্ত্রিক দেশে এত বড় অভিযোগের বিষয়ে সরকারের জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্যের পর ভারতের শাসক দল বিজেপি তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়।
বিজেপির পাল্টা আক্রমণ
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি অভিযোগ করেন, সোরোসের মন্তব্য ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল। তাঁর দাবি, ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করার একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এই মন্তব্য করা হয়েছে।
বিজেপির একাংশের মতে, বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত কিছু সংগঠন, আন্তর্জাতিক মিডিয়া এবং রাজনৈতিক স্বার্থগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
কাশ্মীর ইস্যুতেও সমালোচক ছিলেন সোরোস
এটাই প্রথম নয়। ২০১৯ সালে কাশ্মীর থেকে সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের পরও মোদী সরকারের সমালোচনা করেছিলেন সোরোস। ২০২০ সালে দাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলনে তিনি মন্তব্য করেন যে, কাশ্মীর নীতি এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ভারতের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।
সেই সময়ও বিজেপি তাঁর বক্তব্যকে ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রচারণার অংশ হিসেবে অভিহিত করেছিল।
বিদেশি প্রভাব বনাম জাতীয় সার্বভৌমত্ব
জয়শঙ্করের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে অনেক বিশ্লেষক ভারতের নতুন পররাষ্ট্র ও রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, বর্তমান ভারত আন্তর্জাতিক সমালোচনার জবাব দিতে আগের তুলনায় অনেক বেশি সরব ও আত্মবিশ্বাসী।
সরকারপন্থী মহলের দাবি, ভারতের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে দেশের জনগণ ও ভোটাররা, কোনো বিদেশি অর্থলগ্নিকারী বা আন্তর্জাতিক শক্তি নয়। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, সরকারের নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা বা সমালোচনা করাকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখানো গণতান্ত্রিক বিতর্ককে সীমিত করতে পারে।
সামনে কী?
জর্জ সোরোসকে ঘিরে বিতর্ক এখন আর কেবল একজন ধনকুবেরের মন্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, বিদেশি প্রভাব এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কে পরিণত হয়েছে।
আগামী মাসগুলোতে এই বিতর্ক আরও তীব্র হবে কি না, তা সময়ই বলবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, সোরোস বনাম মোদী সরকার ইস্যু এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম আলোচিত সংঘাতে পরিণত হয়েছে।
মন্তব্য করুন