১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়ের পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর বাংলাদেশে দেশটির প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার হলেও পাকিস্তান-সংশ্লিষ্ট কিছু নেটওয়ার্কের কার্যক্রম নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ হলো বাংলাদেশিদের লক্ষ্য করে সংঘবদ্ধ মানব অঙ্গ পাচার।
একাধিক গোয়েন্দা সূত্র ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকের দাবি, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের (ISI) পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত একটি চক্র চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের পাকিস্তানে নিয়ে যাচ্ছে। ভুক্তভোগীদের মাসিক ৭৫০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত বেতনের চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্রগুলোর দাবি, চাকরির প্রলোভনে পাকিস্তানের লাহোরে নিয়ে যাওয়ার পর ভুক্তভোগীদের বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার নামে ভর্তি করা হয়। পরে তাদের অজ্ঞান করে অবৈধভাবে একটি কিডনি অপসারণ করা হয় বলে অভিযোগ। প্রতারণার বিষয়টি জানতে পারার পর তাদের নির্জন স্থানে আটকে রাখা হয় এবং পরে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। ফেরত পাঠানোর আগে তাদের দিয়ে এমন নথিতে স্বাক্ষর করানো হয়, যাতে উল্লেখ থাকে যে তারা স্বেচ্ছায় আত্মীয়দের কিডনি দান করেছেন।
জানা গেছে, অন্তত চারটি চক্র বাংলাদেশ থেকে লোক সংগ্রহের সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে লাহোর পুলিশ একটি নেটওয়ার্ক শনাক্ত করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। ওই নেটওয়ার্কটি ‘জাকির ট্রেডার্স (প্রাইভেট) লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে পরিচালিত হচ্ছিল বলে অভিযোগ। প্রতিষ্ঠানটির মালিক পাকিস্তানি নাগরিক জাকির হোসেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, লাহোরের কয়েকটি হাসপাতাল ও বেসরকারি ক্লিনিক জাল কাগজপত্র ও অনুমোদনের মাধ্যমে অবৈধ অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সঙ্গে জড়িত। ভুক্তভোগীদের বৈধ চিকিৎসার নামে ভর্তি করা হলেও অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনগত ও নৈতিক বিধি অনুসরণ করা হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
মাগুরার শালিখা উপজেলার আড়পাড়া এলাকার বাসিন্দা মীর তালহা জুবায়ের আদনান নামে এক বাংলাদেশি নাগরিক লাহোর পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে তিনি বলেন, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাকে পাকিস্তানে নেওয়া হয় এবং তার পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। পরে কিডনি দিতে চাপ প্রয়োগ করা হয়। এর বিনিময়ে তাকে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অঙ্গ পাচারকে মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে মানব অঙ্গের বাণিজ্যিক লেনদেন আইনত নিষিদ্ধ।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, পাকিস্তানের কিছু অপরাধী চক্র বাংলাদেশিদের বিভিন্নভাবে এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকিতে ফেলছে। তবে এই অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। প্রতিবেদনে নিজেও উল্লেখ করা হয়েছে যে এ ধরনের অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে আরও বলা হয়েছে, ঢাকায় অবস্থানরত পাকিস্তান-সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির চলাফেরা এবং তার কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ করা হয়েছে যে তিনি মানব অঙ্গ পাচার নেটওয়ার্কের কার্যক্রমে সহায়তা করছিলেন। তবে এ দাবিগুলোরও স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পর থেকে অজানা সংখ্যক বাংলাদেশি এসব চক্রের শিকার হয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে অভিযোগগুলোর প্রকৃত ব্যাপ্তি এখনো স্পষ্ট নয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি তদন্ত প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে তা শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচিত হবে। তাই বিষয়টি নিয়ে সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমন্বিত তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।সূত্র: সালাহ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরী রচিত প্রতিবেদন, Blitz।
মন্তব্য করুন