আগামী বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করা হবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং ব্যাংক খাতের গভীর সংকটের মধ্যে আসছে নতুন এই বাজেটকে ঘিরে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা যেমন রয়েছে, তেমনি অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগও বাড়ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হচ্ছে ৯ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার মধ্যে। বিপরীতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) সংগ্রহ করতে হবে প্রায় ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।
ফলে আগামী অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৩৫ হাজার থেকে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকায়। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, বাস্তবায়নের সময় এই ঘাটতি পৌনে ৩ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশের সমান।
ব্যাংক ঋণের ওপর বাড়তি নির্ভরতা
বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এছাড়া ব্যাংক বহির্ভূত খাত থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
চলতি অর্থবছরেও ব্যাংক ঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্য ছিল। সংশোধিত বাজেটে ব্যাংক ঋণের লক্ষ্য বাড়িয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা করা হয় এবং প্রথম নয় মাসেই সরকার ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ব্যাংক ঋণ নিতে বাধ্য হতে পারে। এতে ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহ আরও সংকুচিত হবে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক নয়।
সংকটে ব্যাংক খাত
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ।
মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা।
একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের প্রভিশন ঘাটতি ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অনেক ব্যাংক প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণে ব্যর্থ হচ্ছে। তারল্য সংকটের কারণে কিছু ব্যাংক প্রতিদিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ সহায়তার ওপর নির্ভর করে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ব্যাংকারদের মতে, এমন নাজুক পরিস্থিতিতে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ ব্যাংক খাতের ওপর আরও বড় চাপ সৃষ্টি করবে।
বেসরকারি খাতের জন্য সতর্ক সংকেত
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার যখন ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করে, তখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের তুলনায় সরকারকে ঋণ দিতে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে।
ফলে নতুন শিল্প স্থাপন, উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং কাঁচামাল আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন সংকুচিত হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের ওপর।
বিশেষ করে ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, তারাই সাধারণত ব্যাংক ঋণের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল।
সামাজিক কর্মসূচিতে বাড়তি ব্যয়
সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে নতুন বাজেটে চারটি প্রধান কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য অর্থ বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে।
এর মধ্যে নারীপ্রধান ৪১ লাখ পরিবারকে মাসে আড়াই হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা দেওয়ার “ফ্যামিলি কার্ড” কর্মসূচিতে প্রথম বছরেই ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১২ হাজার ৩৮৪ কোটি টাকা।
এছাড়া কৃষক কার্ড, দেশব্যাপী খাল খনন এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতেও বড় অঙ্কের ব্যয় হবে। একই সঙ্গে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) সম্ভাব্য আকার ধরা হচ্ছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা।
সুদ পরিশোধে রেকর্ড ব্যয়
অর্থ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে শুধু অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধেই সরকারের ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি বাজেটের সবচেয়ে বড় অনুৎপাদনশীল ব্যয়, যা উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য অর্থের প্রাপ্যতা কমিয়ে দেয়।
প্রবৃদ্ধি নিয়ে শঙ্কা
সরকার আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৬ থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণের পরিকল্পনা করছে। তবে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ধারণা, ঋণ সংকোচন, জ্বালানি সংকট এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে প্রবৃদ্ধি ৪ থেকে ৪ দশমিক ৭ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
কর সংস্কারের তাগিদ
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি ও পিআরআই-এর অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, শুধুমাত্র ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। কর ফাঁকি রোধ, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি এবং কর প্রশাসনে প্রকৃত সংস্কার আনাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কর অব্যাহতি ও কর রেয়াত প্রদানের ক্ষেত্রে অনেক সময় অর্থনৈতিক যুক্তির পাশাপাশি রাজনৈতিক ও করপোরেট প্রভাবও কাজ করে। তাই একটি কার্যকর, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে একদিকে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা, অন্যদিকে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা। বাজেটের সফলতা নির্ভর করবে শুধু এর আকারের ওপর নয়, বরং বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দক্ষতার ওপর।
মন্তব্য করুন