দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন দামে মানুষের বড় অংশই চরম চাপে পড়েছে। আয় বাড়ছে না, কিন্তু সংসারের খরচ বাড়তেই থাকায় হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গত কয়েক বছরে বিভিন্ন সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মূলত একই পথ অনুসরণ করেছে—সুদের হার বাড়ানো। আওয়ামী লীগ সরকার থেকে শুরু করে অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকার এবং বর্তমান বিএনপি জোট সরকারও বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির মাধ্যমে সুদের হার বাড়ানোর নীতিতে অটল রয়েছে।
অর্থনীতির প্রচলিত তত্ত্ব অনুযায়ী, সুদের হার বাড়লে বাজারে অর্থের প্রবাহ কমে যায়। মানুষ খরচ কমায়, ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমে এবং এতে মূল্যস্ফীতি কমার কথা। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশে তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। সুদের হার বাড়লেও মূল্যস্ফীতি কমেনি, বরং অর্থনীতির অন্যান্য খাত দুর্বল হয়ে পড়ছে।
ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্যারোলিন এলভিস সম্প্রতি ‘প্রজেক্ট সিন্ডিকেট’-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলেছেন, বর্তমান বিশ্বে শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কারণ বর্তমান মূল্যস্ফীতির বড় অংশই ‘কস্ট পুশ’ বা ব্যয়জনিত, চাহিদাজনিত নয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, কাঁচামাল ও আমদানিপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় আমদানি খরচ আরও বেড়েছে। এর ফলে বাজারে পণ্যের দাম বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে সুদের হার বাড়ালে ঋণের খরচও বাড়ে, যা আবার উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, উচ্চ সুদের কারণে নতুন বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ঋণ নিতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এতে শিল্প সম্প্রসারণ থেমে যাচ্ছে এবং কর্মসংস্থানও কমছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতিকে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ বা প্রবৃদ্ধিহীন মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির একটি বড় অংশ কৃত্রিমভাবে তৈরি হচ্ছে। চাল, ডাল, চিনি, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেট ও একচেটিয়া ব্যবসার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সুদের হার বাড়িয়ে এসব গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বরং সাধারণ ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু সুদের হার নয়, বরং সমন্বিত কৌশল প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে বাজার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, দেশীয় উৎপাদনে ভর্তুকি ও প্রণোদনা, আমদানিনির্ভরতা কমানো, টাকার মান স্থিতিশীল রাখা এবং জ্বালানিতে স্বনির্ভরতা বাড়ানো।
এছাড়া অতিমুনাফাকারী করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ‘উইন্ডফল ট্যাক্স’ বা অতিরিক্ত মুনাফার কর আরোপের পরামর্শও দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, যদি শুধু সুদের হার বাড়ানোর নীতিতেই সরকার অনড় থাকে, তাহলে মূল্যস্ফীতি কমবে না, বরং বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি বড় ধরনের স্থবিরতার মুখে পড়তে পারে।
মন্তব্য করুন