ঢাকা: বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের ওপর সহিংসতা, যৌন নির্যাতন ও পাশবিক নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। সংস্থাটি বলেছে, “শিশুদের ওপর নৃশংসতা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।”
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান উল্লেখ করে ইউনিসেফ জানায়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত দেশে ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একই সময়ে ৪৬ শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ শিশুকে। ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয়েছে আরও ৩ শিশুকে। এ ছাড়া লোকলজ্জা, সামাজিক চাপ ও মানসিক ট্রমা সহ্য করতে না পেরে ২ শিশু আত্মহত্যা করেছে।
পরিসংখ্যানে আরও উঠে এসেছে, শুধু জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যেই বিভিন্ন ঘটনায় ১১৫ শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এসব তথ্য দেশের শিশু সুরক্ষা পরিস্থিতির ভয়াবহ ও নাজুক চিত্র সামনে নিয়ে এসেছে।
সম্প্রতি রাজধানীতে ৮ বছর বয়সী শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার নির্মম ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটেই ইউনিসেফ বাংলাদেশ সরকারের প্রতি জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্সের পক্ষে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, সারা দেশে ছেলে ও মেয়ে শিশুদের ওপর যেভাবে ভয়াবহ সহিংসতা ও যৌন নির্যাতন চালানো হচ্ছে, তাতে ইউনিসেফ গভীরভাবে মর্মাহত ও শোকাহত।
বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৬ সালের বর্তমান সময়েও নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে এমন নৃশংসতা বৃদ্ধি পাওয়া প্রমাণ করে যে, শিশু সুরক্ষা এবং জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার দায়মুক্তির সংস্কৃতি অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
ইউনিসেফ বলেছে, শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। শিশুবান্ধব পুলিশিং ও বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে স্কুল, মাদরাসা, পাড়া-মহল্লা ও স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহিতা গড়ে তুলতে হবে।
সংস্থাটি আরও বলেছে, সহিংসতার বিরুদ্ধে সমাজের প্রতিটি মানুষকে সরব হতে হবে। পরিবার, প্রতিবেশী, শিক্ষক, স্থানীয় নেতৃত্ব, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী সবাইকে শিশু সুরক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। সমাজ চুপ থাকলে অপরাধীরা সাহস পায় এবং সহিংসতা আরও ছড়িয়ে পড়ে।
কোনো শিশু নির্যাতন, শোষণ বা যৌন সহিংসতার শিকার হলে তা গোপন না রেখে অবিলম্বে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা শিশু সহায়তা হেল্পলাইন ১০৯৮ নম্বরে যোগাযোগ করার আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ।
ভুক্তভোগী শিশু ও নারীদের মর্যাদা রক্ষার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি। বিবৃতিতে বলা হয়, নির্যাতনের শিকার শিশুদের ছবি, ভিডিও বা ব্যক্তিগত পরিচয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা আরেকটি গুরুতর অপরাধ। এতে ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের মানসিক আঘাত ও ট্রমা আরও বেড়ে যায়।
ইউনিসেফ জনগণ, সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, প্রতিটি শিশুর ঘর, স্কুল ও জনপরিসরে নিরাপদ থাকার অধিকার রয়েছে। তাই ভুক্তভোগী শিশু ও তাদের পরিবারের অধিকার, মর্যাদা ও গোপনীয়তাকে সম্মান জানাতে হবে। সংবেদনশীল ছবি, ভিডিও বা ব্যক্তিগত তথ্য প্রচার থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে।
সংস্থাটি মনে করে, শিশুদের ওপর সহিংসতা প্রতিরোধে শুধু আইন করলেই হবে না, আইনের কার্যকর প্রয়োগ, দ্রুত বিচার, সামাজিক সচেতনতা এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। শিশু সুরক্ষা এখন আর কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব।
মন্তব্য করুন