বাংলাদেশ নৌ সদর দপ্তরে শীর্ষ নেতৃত্বে রদবদল, বিতর্কিত রিয়ার অ্যাডমিরাল গোলাম সাদেককে গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে
বাংলাদেশের সামরিক নেতৃত্বের ভেতরে জবাবদিহিতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন ওঠার মতো এক পদক্ষেপে, দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদকের তদন্তাধীন একজন উচ্চপদস্থ নৌ কর্মকর্তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে নৌ সদর দপ্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদে বদলি করা হয়েছে।
নর্থইস্ট নিউজের হাতে আসা সরকারি নথিতে দেখা যায়, রিয়ার অ্যাডমিরাল গোলাম সাদেক (পি নম্বর ৬৮৯) গত ২৩ আগস্ট সহকারী নৌবাহিনী প্রধান (অভিযান) পদে নিয়োগ পেয়েছেন। আগামী ৩০ আগস্টের মধ্যে তাঁর নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করার কথা।
বাংলাদেশ নৌবাহিনী থেকে জারি করা উচ্চপর্যায়ের একাধিক সামরিক পদায়নপত্রে শীর্ষ নেতৃত্বে ব্যাপক রদবদলের চিত্র পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, বর্তমানে জনসমক্ষে আলোচিত এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারিতে থাকা একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদে পুনর্বিন্যাস করা।
ঢাকার বনানীতে নৌ সদর দপ্তরের নৌ সচিবালয়ের সরকারি নথিতেও নিশ্চিত করা হয়েছে যে রিয়ার অ্যাডমিরাল গোলাম সাদেককে সহকারী নৌবাহিনী প্রধান (অভিযান) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
রিয়ার অ্যাডমিরাল সাদেককে ৩০ আগস্ট ২০২৬-এর মধ্যে বিএনএস হাজী মহসিনে (অতিরিক্ত) যোগ দিতে বলা হয়েছে। আর্থিক সম্পদসংক্রান্ত বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত চলমান থাকা অবস্থাতেই তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব নিচ্ছেন। এর আগে নর্থইস্ট নিউজের প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান এই তদন্তের বিষয়টি উঠে এসেছিল।
বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন জ্যেষ্ঠ নৌ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করতে পারেনি। একই সময়ে সংস্থাটিতে নেতৃত্বের শূন্যতা রয়েছে। ৩ মার্চ ২০২৬ থেকে দেশের প্রধান দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটিতে কোনো চেয়ারম্যান নেই।
সাবেক দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এবং অন্য কমিশনাররা একযোগে পদত্যাগ করেন। এরপর নতুন চেয়ারম্যানের নাম সুপারিশের জন্য আপিল বিভাগের বিচারপতি মোহাম্মদ রেজাউল হকের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করে সরকার।
দুদকের নজরদারিতে থাকা জ্যেষ্ঠ নৌ কর্মকর্তাদের মধ্যে সাবেক নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল নাজমুল হাসানও রয়েছেন। তিনি ১৬ জুলাই ২০২৬ অবসর নেন। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানও দুদকের নজরদারির মধ্যে রয়েছেন।
দুদকের নথি এবং সংশ্লিষ্ট অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সাবেক নৌপ্রধান নাজমুল হাসানের যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ায় বেনামি সম্পত্তি রয়েছে বলে অভিযোগ আছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানটি রিয়ার অ্যাডমিরাল গোলাম সাদেককে ঘিরে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের একটি বড় ক্রয় প্রকল্পে অনিয়মে তাঁর কথিত সম্পৃক্ততার অভিযোগে আনুষ্ঠানিক দুদক অনুসন্ধান শুরু হয়।
তদন্তটির মূল বিষয় হচ্ছে, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ৩৫টি ড্রেজার ও সহায়ক নৌযান ক্রয়। ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর পাওয়া ৫২টি অভিযোগ যাচাই করার পর দুদক একটি অভিযোগ পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানের জন্য নির্বাচন করে।
অভিযোগটি করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের আইনজীবী মোহাম্মদ আলী আজগর ফকির। অভিযোগে সাবেক বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান কমোডর, পরে রিয়ার অ্যাডমিরাল, গোলাম সাদেকের নাম রয়েছে। এছাড়া সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবদুল মতিন, বর্তমান বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা এবং সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগগুলো শুধু ক্রয়সংক্রান্ত অনিয়মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগও করা হয়েছে। দুদক বিষয়টি তাদের বিশেষ তদন্ত অধিদপ্তরে পাঠায় এবং সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ রাকিবুল হায়াতকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়।
তদন্তকারীরা প্রকল্প প্রস্তাব, ব্যয়ের হিসাব, দরপত্রের কাগজপত্র, মূল্যায়ন প্রতিবেদন, চুক্তিপত্র, কার্যাদেশ এবং অর্থ পরিশোধের নথিসহ ব্যাপক পরিমাণ ক্রয়সংক্রান্ত তথ্য চেয়েছিলেন। এছাড়া ক্রয়প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের চাকরিসংক্রান্ত নথিও চাওয়া হয়।
তদন্ত একপর্যায়ে রিয়ার অ্যাডমিরাল সাদেককে জিজ্ঞাসাবাদের পর্যায়ে পৌঁছায়। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২২ ধারার অধীনে জারি করা একটি নোটিশে তাঁকে ২০২৫ সালের ৫ মার্চ ঢাকায় তদন্তকারীদের সামনে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সে সময় তিনি খুলনা নৌ অঞ্চলের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
তদন্তকারীরা বিশেষভাবে যাচাই করছিলেন, ড্রেজার ও সহায়ক নৌযান কেনার ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না এবং প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কোনো কর্মকর্তা বেআইনি আর্থিক সুবিধা নিয়েছিলেন কি না।
তবে অনুসন্ধানটি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক অচলাবস্থা এবং কার্যকর নেতৃত্বের ঘাটতি ক্ষমতাবান কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের স্পর্শকাতর তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
নর্থইস্ট নিউজ যে নথিগুলো পর্যালোচনা করেছে, সেগুলো রাষ্ট্রের ঠিক কত টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে তা প্রতিষ্ঠা করে না। কোন নির্দিষ্ট চুক্তিতে কারসাজি হয়েছে, তাও এসব নথি চিহ্নিত করে না। একইভাবে এসব নথি কারও অপরাধ প্রমাণের দলিলও নয়।
অনুসন্ধান এখনো তদন্ত পর্যায়েই রয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়নি। অভিযোগে যেসব ব্যক্তির নাম রয়েছে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের সবাইকে নির্দোষ বলে বিবেচনা করা হবে।
সাম্প্রতিক পদায়নের আদেশগুলো ২৩ আগস্ট ২০২৬ “নৌবাহিনী প্রধানের আদেশক্রমে” জারি করা হয় এবং কমোডর সাব্বির আহমেদ খান তাতে স্বাক্ষর করেন। এসব পদায়নপত্রে উপকূলীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক নৌ কমান্ড এবং সামুদ্রিক উৎপাদনসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দায়িত্ব পরিবর্তনের তথ্য রয়েছে।
রিয়ার অ্যাডমিরাল সাদেক ছাড়াও আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন।
রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. মঈনুল হাসান: বিএনএস ইসা খান/কমচিট থেকে বদলি হয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রেষণে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তাঁকে ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে বিএনএস ঢাকায় (অতিরিক্ত) যোগ দিতে বলা হয়েছে।
রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ জিয়াউল হক: বিএনএস ইসা খানে (অতিরিক্ত) চট্টগ্রাম নৌ অঞ্চলের কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। তাঁকে ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণ করতে বলা হয়েছে।
রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ আবদুল লতিফ: বিএনএস শের-ই-বাংলা থেকে বদলি হয়ে খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তাঁকে ২৭ আগস্ট ২০২৬-এর মধ্যে বিএনএস তিতুমীরে (অতিরিক্ত) যোগ দিতে বলা হয়েছে।
কমোডর মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান: নৌ সদর দপ্তরের নৌ সচিব হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। তাঁকে বিএনএস হাজী মহসিনে (অতিরিক্ত) যোগ দিতে বলা হয়েছে। তাঁর পদায়নপত্রের তারিখ ১৯ আগস্ট ২০২৬ এবং দায়িত্ব গ্রহণের নির্ধারিত সময় ছিল ২৩ আগস্ট ২০২৬।
কমোডর আবুল ফজল মুহাম্মদ আহসান উদ্দিন: চীনে প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত অধ্যয়ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জন্য বিএনএস হাজী মহসিনে (অতিরিক্ত) পদায়ন করা হয়েছে। তাঁকে ২৬ আগস্ট ২০২৬-এর মধ্যে যোগ দিতে বলা হয়েছে।
নৌবাহিনীর এই বৃহত্তর অভিযানিক ও নেতৃত্ব পর্যায়ের পুনর্বিন্যাস এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে হচ্ছে, যখন দুর্নীতিবিরোধী অনুসন্ধান এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে দুদকের তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় সহকারী নৌবাহিনী প্রধান (অভিযান)-এর মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে একজন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি জবাবদিহিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে।
মন্তব্য করুন