ঢাকা ০৯:২১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

“হাসপাতালে শিশুদের মৃত্যু বাড়ছে, আলোচনায় তবু গ্ল্যামার জগত”

বিশেষ প্রতিনিধি :-
  • Update Time : ০৪:০৩:৫৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
  • / ৬ Time View

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনাগুলো নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাড়ছে ক্ষোভ ও প্রশ্ন। হামে সরকারি হিসাবে প্রায় ৫০০ শিশু মারা গেছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। আবার বেসরকারি সূত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক কিছু দাবিতে এই সংখ্যা ১৩০০ থেকে ৩৫০০ পর্যন্ত হতে পারে বলেও উল্লেখ করা হচ্ছে। তবে এসব বেসরকারি সংখ্যার স্বাধীন যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি।

একদিকে হাসপাতালগুলোতে অপুষ্টি, চিকিৎসাসংকট ও অব্যবস্থাপনার কারণে শিশু মৃত্যুর অভিযোগ উঠছে, অন্যদিকে পরিচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যক্তিত্ব বা সেলিব্রিটিদের মৃত্যু ঘিরে ব্যাপক প্রচার ও জনসমাগম নিয়ে সমালোচনা করছেন অনেকে।

বিশেষ করে শহীদ মিনারে এক জনপ্রিয় টিকটক ব্যক্তিত্বের মরদেহ নেওয়া এবং তা ঘিরে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক কাভারেজের পর নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের প্রশ্ন—“প্রতিদিন যেসব দরিদ্র শিশু চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছে, তাদের জন্য একই রকম সামাজিক শোক বা রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব কেন দেখা যায় না?”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্টে দাবি করা হচ্ছে, দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের মৃত্যু সাধারণত সংবাদে খুব অল্প সময় জায়গা পায়। অথচ পরিচিত মুখদের মৃত্যু ঘিরে টেলিভিশন, অনলাইন পোর্টাল এবং সামাজিক মাধ্যমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা চলে। এই বৈষম্যকে অনেকে “শোকের শ্রেণিবিভাগ” হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।

একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী লেখেন, “যে শিশু হাসপাতালের বারান্দায় চিকিৎসা না পেয়ে মারা যায়, তার মুখে গ্ল্যামার নেই, তাই সে জাতীয় আলোচনায় আসে না।” একই ধরনের আরও বহু পোস্টে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

সমালোচকদের অভিযোগ, সমাজে পরিচিত, প্রভাবশালী বা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা ব্যক্তিরা দ্রুত সহানুভূতি ও প্রচার পান। কিন্তু দরিদ্র মানুষের দুর্ভোগ অনেক সময় শুধুই পরিসংখ্যান হয়ে থাকে। তাদের মতে, এই বাস্তবতা বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যেরই প্রতিফলন।

তবে গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের একটি অংশ বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় ব্যক্তিদের মৃত্যু স্বাভাবিকভাবেই বেশি জনআগ্রহ তৈরি করে, ফলে সংবাদমাধ্যমও সেটিকে গুরুত্ব দেয়। কিন্তু একইসঙ্গে তারা স্বীকার করেন, জনস্বাস্থ্য সংকট, শিশু অপুষ্টি ও চিকিৎসাব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রয়োজন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু মৃত্যুর পেছনে অপুষ্টি, দারিদ্র্য, চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা এবং সচেতনতার অভাব বড় কারণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সমস্যা রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে রেখে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রয়োজন।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষুব্ধ অনেকেই বলছেন, “একটি সমাজ তখনই মানবিক হয়, যখন সবচেয়ে দুর্বল মানুষের জীবনকেও সমান মূল্য দেওয়া হয়।”

শিশু মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা, কারণ এবং দায় নির্ধারণে স্বচ্ছ তদন্ত ও সরকারি তথ্য প্রকাশের দাবিও জানিয়েছেন অনেকে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

“হাসপাতালে শিশুদের মৃত্যু বাড়ছে, আলোচনায় তবু গ্ল্যামার জগত”

Update Time : ০৪:০৩:৫৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনাগুলো নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাড়ছে ক্ষোভ ও প্রশ্ন। হামে সরকারি হিসাবে প্রায় ৫০০ শিশু মারা গেছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। আবার বেসরকারি সূত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক কিছু দাবিতে এই সংখ্যা ১৩০০ থেকে ৩৫০০ পর্যন্ত হতে পারে বলেও উল্লেখ করা হচ্ছে। তবে এসব বেসরকারি সংখ্যার স্বাধীন যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি।

একদিকে হাসপাতালগুলোতে অপুষ্টি, চিকিৎসাসংকট ও অব্যবস্থাপনার কারণে শিশু মৃত্যুর অভিযোগ উঠছে, অন্যদিকে পরিচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যক্তিত্ব বা সেলিব্রিটিদের মৃত্যু ঘিরে ব্যাপক প্রচার ও জনসমাগম নিয়ে সমালোচনা করছেন অনেকে।

বিশেষ করে শহীদ মিনারে এক জনপ্রিয় টিকটক ব্যক্তিত্বের মরদেহ নেওয়া এবং তা ঘিরে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক কাভারেজের পর নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের প্রশ্ন—“প্রতিদিন যেসব দরিদ্র শিশু চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছে, তাদের জন্য একই রকম সামাজিক শোক বা রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব কেন দেখা যায় না?”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্টে দাবি করা হচ্ছে, দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের মৃত্যু সাধারণত সংবাদে খুব অল্প সময় জায়গা পায়। অথচ পরিচিত মুখদের মৃত্যু ঘিরে টেলিভিশন, অনলাইন পোর্টাল এবং সামাজিক মাধ্যমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা চলে। এই বৈষম্যকে অনেকে “শোকের শ্রেণিবিভাগ” হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।

একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী লেখেন, “যে শিশু হাসপাতালের বারান্দায় চিকিৎসা না পেয়ে মারা যায়, তার মুখে গ্ল্যামার নেই, তাই সে জাতীয় আলোচনায় আসে না।” একই ধরনের আরও বহু পোস্টে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

সমালোচকদের অভিযোগ, সমাজে পরিচিত, প্রভাবশালী বা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা ব্যক্তিরা দ্রুত সহানুভূতি ও প্রচার পান। কিন্তু দরিদ্র মানুষের দুর্ভোগ অনেক সময় শুধুই পরিসংখ্যান হয়ে থাকে। তাদের মতে, এই বাস্তবতা বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যেরই প্রতিফলন।

তবে গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের একটি অংশ বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় ব্যক্তিদের মৃত্যু স্বাভাবিকভাবেই বেশি জনআগ্রহ তৈরি করে, ফলে সংবাদমাধ্যমও সেটিকে গুরুত্ব দেয়। কিন্তু একইসঙ্গে তারা স্বীকার করেন, জনস্বাস্থ্য সংকট, শিশু অপুষ্টি ও চিকিৎসাব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রয়োজন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু মৃত্যুর পেছনে অপুষ্টি, দারিদ্র্য, চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা এবং সচেতনতার অভাব বড় কারণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সমস্যা রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে রেখে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রয়োজন।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষুব্ধ অনেকেই বলছেন, “একটি সমাজ তখনই মানবিক হয়, যখন সবচেয়ে দুর্বল মানুষের জীবনকেও সমান মূল্য দেওয়া হয়।”

শিশু মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা, কারণ এবং দায় নির্ধারণে স্বচ্ছ তদন্ত ও সরকারি তথ্য প্রকাশের দাবিও জানিয়েছেন অনেকে।