ঢাকা ০৭:২৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ক্ষমতার অদৃশ্য করিডোর: খালিলুর রহমান কি ‘টেকনোক্র্যাট’ নাকি নতুন শক্তিকেন্দ্র?

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৪:১০:২৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
  • ১ Time View

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার খেলা কখনোই কেবল নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং প্রায়শই এর পেছনে কাজ করে একাধিক ‘অদৃশ্য’ শক্তিকেন্দ্র—যারা আনুষ্ঠানিক রাজনীতির বাইরে থেকেও সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করে। সাম্প্রতিক সময়ে খালিলুর রহমানকে ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা এই পুরোনো বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

একজন ক্যারিয়ার কূটনীতিকের আন্তর্জাতিক সক্রিয়তা অবশ্যই অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু যখন সেই সক্রিয়তা দ্রুত প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর সঙ্গে মিশে যেতে শুরু করে, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে—এটি কি কেবল পেশাগত সাফল্য, নাকি ক্ষমতার কাঠামোয় নতুন এক ‘অদৃশ্য প্রবেশ’?

খালিলুর রহমানের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তার আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, পশ্চিমা বিশ্বে গ্রহণযোগ্যতা, এবং নীতিনির্ধারণে ক্রমবর্ধমান প্রভাব—সব মিলিয়ে তিনি এখন আর শুধুই একজন কূটনীতিক নন; বরং একটি সম্ভাব্য শক্তিকেন্দ্র। কিন্তু এই শক্তির উৎস কোথায়? জনগণের ম্যান্ডেট নয়, দলীয় রাজনীতির দীর্ঘ পথচলাও নয়—তাহলে এই প্রভাবের বৈধতা কীভাবে নির্ধারিত হবে?

এখানেই আসে ‘টেকনোক্র্যাট’ বিতর্ক। সরকার যদি দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে কাউকে সামনে আনে, তা স্বাগত। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন এই টেকনোক্র্যাটরা ধীরে ধীরে এমন সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে অবস্থান নেন, যেগুলো মূলত রাজনৈতিক জবাবদিহিতার আওতায় থাকা উচিত। এতে করে ক্ষমতা গণতান্ত্রিক কাঠামো থেকে সরে গিয়ে ‘অ্যাকাউন্টেবল নয়’ এমন একটি বৃত্তে আটকে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

আরও উদ্বেগজনক হলো জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত ইস্যুতে তার সম্পৃক্ততা। বাংলাদেশের মতো একটি দেশে, যেখানে সামরিক ও বেসামরিক ভারসাম্য অত্যন্ত সংবেদনশীল, সেখানে নতুন কোনো শক্তিশালী বেসামরিক কেন্দ্রের আবির্ভাব সহজেই সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। ইতিহাস বলছে—এই ভারসাম্য নষ্ট হলে তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হয়।

‘আরাকান করিডোর’-এর মতো প্রস্তাবও এই প্রেক্ষাপটে নতুন প্রশ্ন তোলে। এটি কি নিছক মানবিক উদ্যোগ, নাকি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের অংশ? এবং যদি তা-ই হয়, তবে সেই কৌশল নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় কতটা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা রয়েছে?

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই এখনো অমীমাংসিত—খালিলুর রহমান কি কেবল একজন দক্ষ নীতিনির্ধারক, নাকি তিনি এমন এক নতুন ক্ষমতার ধারা তৈরি করছেন, যা দৃশ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রভাব ফেলবে?

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য এটি কোনো তাত্ত্বিক প্রশ্ন নয়, বরং বাস্তব উদ্বেগ। কারণ ইতিহাস দেখিয়েছে—যখন ক্ষমতা দৃশ্যমান কাঠামো ছেড়ে অদৃশ্য করিডোরে সরে যায়, তখন জবাবদিহিতা হারিয়ে যায়, প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়, আর সিদ্ধান্ত হয়ে ওঠে ব্যক্তি-নির্ভর।

খালিলুর রহমানের উত্থান তাই কেবল একজন ব্যক্তির গল্প নয়—এটি বাংলাদেশের ক্ষমতার ভবিষ্যৎ বিন্যাসের একটি সতর্ক সংকেত।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

ক্ষমতার অদৃশ্য করিডোর: খালিলুর রহমান কি ‘টেকনোক্র্যাট’ নাকি নতুন শক্তিকেন্দ্র?

ক্ষমতার অদৃশ্য করিডোর: খালিলুর রহমান কি ‘টেকনোক্র্যাট’ নাকি নতুন শক্তিকেন্দ্র?

Update Time : ০৪:১০:২৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার খেলা কখনোই কেবল নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং প্রায়শই এর পেছনে কাজ করে একাধিক ‘অদৃশ্য’ শক্তিকেন্দ্র—যারা আনুষ্ঠানিক রাজনীতির বাইরে থেকেও সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করে। সাম্প্রতিক সময়ে খালিলুর রহমানকে ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা এই পুরোনো বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

একজন ক্যারিয়ার কূটনীতিকের আন্তর্জাতিক সক্রিয়তা অবশ্যই অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু যখন সেই সক্রিয়তা দ্রুত প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর সঙ্গে মিশে যেতে শুরু করে, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে—এটি কি কেবল পেশাগত সাফল্য, নাকি ক্ষমতার কাঠামোয় নতুন এক ‘অদৃশ্য প্রবেশ’?

খালিলুর রহমানের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তার আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, পশ্চিমা বিশ্বে গ্রহণযোগ্যতা, এবং নীতিনির্ধারণে ক্রমবর্ধমান প্রভাব—সব মিলিয়ে তিনি এখন আর শুধুই একজন কূটনীতিক নন; বরং একটি সম্ভাব্য শক্তিকেন্দ্র। কিন্তু এই শক্তির উৎস কোথায়? জনগণের ম্যান্ডেট নয়, দলীয় রাজনীতির দীর্ঘ পথচলাও নয়—তাহলে এই প্রভাবের বৈধতা কীভাবে নির্ধারিত হবে?

এখানেই আসে ‘টেকনোক্র্যাট’ বিতর্ক। সরকার যদি দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে কাউকে সামনে আনে, তা স্বাগত। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন এই টেকনোক্র্যাটরা ধীরে ধীরে এমন সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে অবস্থান নেন, যেগুলো মূলত রাজনৈতিক জবাবদিহিতার আওতায় থাকা উচিত। এতে করে ক্ষমতা গণতান্ত্রিক কাঠামো থেকে সরে গিয়ে ‘অ্যাকাউন্টেবল নয়’ এমন একটি বৃত্তে আটকে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

আরও উদ্বেগজনক হলো জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত ইস্যুতে তার সম্পৃক্ততা। বাংলাদেশের মতো একটি দেশে, যেখানে সামরিক ও বেসামরিক ভারসাম্য অত্যন্ত সংবেদনশীল, সেখানে নতুন কোনো শক্তিশালী বেসামরিক কেন্দ্রের আবির্ভাব সহজেই সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। ইতিহাস বলছে—এই ভারসাম্য নষ্ট হলে তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হয়।

‘আরাকান করিডোর’-এর মতো প্রস্তাবও এই প্রেক্ষাপটে নতুন প্রশ্ন তোলে। এটি কি নিছক মানবিক উদ্যোগ, নাকি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের অংশ? এবং যদি তা-ই হয়, তবে সেই কৌশল নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় কতটা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা রয়েছে?

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই এখনো অমীমাংসিত—খালিলুর রহমান কি কেবল একজন দক্ষ নীতিনির্ধারক, নাকি তিনি এমন এক নতুন ক্ষমতার ধারা তৈরি করছেন, যা দৃশ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রভাব ফেলবে?

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য এটি কোনো তাত্ত্বিক প্রশ্ন নয়, বরং বাস্তব উদ্বেগ। কারণ ইতিহাস দেখিয়েছে—যখন ক্ষমতা দৃশ্যমান কাঠামো ছেড়ে অদৃশ্য করিডোরে সরে যায়, তখন জবাবদিহিতা হারিয়ে যায়, প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়, আর সিদ্ধান্ত হয়ে ওঠে ব্যক্তি-নির্ভর।

খালিলুর রহমানের উত্থান তাই কেবল একজন ব্যক্তির গল্প নয়—এটি বাংলাদেশের ক্ষমতার ভবিষ্যৎ বিন্যাসের একটি সতর্ক সংকেত।