ভারতের অর্থনীতির অধিকাংশ আয় আসে মুসলিম দেশগুলো থেকে, অথচ এই ভারতেই সবচেয়ে বেশী মুসলিমদের নির্যাতন করা হয়

নিজস্ব প্রতিবেদকনিজস্ব প্রতিবেদক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  10:00 PM, 07 June 2022
নূপুর শর্মা ও নবীন জিন্দাল

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)কে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের কারণে কূটনৈতিকভাবে নাজুক অবস্থার মুখে ভারত। এ কথা জানিয়ে অনলাইন আরব নিউজের বিশেষ প্রতিনিধি সঞ্জয় কুমার ‘ইন্ডিয়া ফেসেস ডিপ্লোম্যাটিক ফলআউট ওভার রিমার্কস ইনসালটিং প্রফেট মুহাম্মদ’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন লিখেছেন। এতে তিনি বলেছেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)কে নিয়ে দেশটির ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ কর্তকর্তাদের অবমাননাকর মন্তব্যে মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক বিরোধের মুখোমুখি ভারত। সোমবার বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কূটনৈতিক পর্যায়ে ইসলামিক দেশগুলোর সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটির যথেষ্ট ক্ষতি হতে পারে।

ভারতে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির সুপরিচিত মুখপাত্র নূপুর শর্মা ও নবীন জিন্দাল দুটি আলাদা অনুষ্ঠানে ইসলাম ও মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)কে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন। এতে ভারতের ভিতরে এবং দেশের বাইরে মুসলিমদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
সঞ্জয় কুমার আরও লিখেছেন- সৌদি আরব, কাতার, অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন থেকে এক সঙ্গে কূটনৈতিক উপায়ে ক্ষোভ জানানো ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ ঢেলে দেয়ার পর রোববার নূপুর শর্মা ও নবীন জিন্দালকে যথাক্রমে সাময়িক বরখাস্ত ও দল থেকে বহিষ্কার করেছে বিজেপি। একই সঙ্গে ইসলামিক দেশগুলোতে ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক উঠেছে। এরই মধ্যে কাতারে ভারতীয় পণ্য বর্জন শুরু করেছে। একটি স্টোরে ভারতীয় পণ্যের তাক প্লাস্টিকের পর্দা দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে। তার ওপরে আরবিতে লেখা হয়েছে- আমরা ভারতীয় পণ্য বিক্রি করি না।

ভারতে জনসংখ্যা ১৩৫ কোটি। এর মধ্যে শতকরা প্রায় ১৩ ভাগ হলে মুসলিম সংখ্যালঘু।তাদের ওপর হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা টার্গেট করে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা চালায়। এর মধ্যে ইসলাম ও এর নবীকে নিয়ে ওই বিতর্কিত মন্তব্য করা হয়েছে। ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যারা হামলা করেছে তারা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নিয়মিত নীরবতায় উৎসাহিত হয়েছে। মোদি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর এসব হামলায় তিনি নীরব থেকেছেন।

ইসলাম ও এর নবী মুহাম্মদ (সা.)কে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার কারণে মুসলিম দেশগুলো থেকে সমালোচনার ঝড় বইছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এতে আন্তর্জাতিকভাবে, বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের অবস্থান ঝুঁকিতে পড়েছে।

রাজনৈতিক কর্মী ও ভারতে বিজেপির সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর সাবেক উপদেষ্টা সুধীন্দ্র কুলকারনি এ নিয়ে কথা বলেছেন আরব নিউজের সঙ্গে। তিনি বলেছেন, যা ঘটছে সে বিষয়ে দৃষ্টি দেয়া উচিত ছিল ভারত সরকারের। একই সঙ্গে সক্রিয়ভাবে বন্ধ করা উচিত ছিল ঘৃণামূলক প্রচারণা, রাজনীতি ও কর্মকাণ্ড। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো, ক্ষমতাসীন দল এসবকে অনুমোদন দিয়ে গেছে। মুসলিম-বিরোধী রাজনীতির মূল্য বিজেপিকে নয়, এর মূল্য বহন করতে হবে দেশকে।

মোদির অধীনে ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতি অগ্রাধিকার দিয়েছে আরব দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এবং এসব দেশের সঙ্গে ভারত যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক উপভোগ করছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে আছে তেল আমদানি। উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত আছেন প্রায় ৪০ লাখ ভারতীয়। তারা সেখানে কাজ করে প্রতি বছর ভারতে কমপক্ষে ৮০০০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠান।

দিল্লি ভিত্তিক থিং ট্যাংক অবজার্ভার রিসার্স ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত পররাষ্ট্র বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মনোজ যোশি। তিনি আরব নিউজকে বলেছেন, এসব কারণে ভারতের ওপর ক্ষুব্ধ আরব দুনিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক রাখার সামর্থ রাখে না ভারত। তিলোত্তমা ফাউন্ডেশনের ওয়েস্ট অ্যান্ড সেন্ট্রাল এশিয়া সেন্টারের প্রধান মীনা সিং রয় বলেন, আরব বিশ্বের সঙ্গে একটি স্বর্ণালী দশা অতিক্রম করছে ভারতের সম্পর্ক। তা পথচ্যুত হয়, এমন কিছুই আমাদের করা উচিত নয়।

রাজনীতি বিষয়ক ম্যাগাজিন হার্ড নিউজের প্রধান সম্পাদক সঞ্জয় কাপুর এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়েছেন দেশের নেতৃত্বের প্রতি। তিনি বলেছেন, ভারতের ভাবমূর্তি খুব খারাপভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু কূটনীতির মাধ্যমে এর সমাধান করা যাবে না। এর জন্য ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে।

আরব দেশগুলো থেকে যেসব প্রতিবাদ জানানো হয়েছে সে বিষয়ে এখনও কোনো মন্তব্য করেনি ভারত সরকার। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার বলেছে, এ নিয়ে ওআইসি যে বিবৃতি দিয়েছে তা ‘অন্যায়’ এবং ‘সংকীর্ণমনা’। অন্যদিকে কাতারে ভারতীয় দূতাবাস থেকে যে বিবৃতি দেয়া হয়েছে তাতে বলা হয়েছে, মহানবী মুহাম্মদ (সা.) এবং ইসলাম নিয়ে যে মন্তব্য করা হয়েছে তাতে নয়া দিল্লির দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটেনি। বিজেপি বলেছে, ওই মন্তব্য বিজেপির আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মুখপাত্র সুদেশ বর্মা আরব নিউজকে বলেছেন, কোনো ধর্মের শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তিদের অসম্মান করায় বিশ্বাস করে না বিজেপি।

যেহেতু দেশে মুসলিম সংখ্যালঘুদের সঙ্গে আচরিত রীতি ‘জনগণের বড় উদ্বেগের কারণ’, তাই ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী যশবন্ত সিনহা বলেছেন, সর্বশেষ এই বিতর্ক পরিবর্তনের পথ করে দিতে পারে। তিনি আরও বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠদের বিপুল সংখ্যক মানুষ এই মন্তব্যকে অনুমোদন করেনি। যেহেতু এখন দেশের বাইরে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, তাই এসব মানুষ আরও সতর্ক হয়ে যাবে।

ওদিকে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী টুইটারে বলেছেন, বৈশ্বিক পর্যায়ে দেশের ক্ষমতাসীন দলের কর্মকাণ্ড দেশকে দুর্বল করে তুলছে। বিজেপির লজ্জাজনক গোঁড়ামি আমাদেরকে শুধু আইসোলেট বা নিঃসঙ্গই করছে এমন নয়। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী ভারতের অবস্থানের ক্ষতি করেছে।