২০০৭ সা‌লে শেখ হা‌সিনার মু‌ক্তির জন্য বেগম খা‌লেদা জিয়া দাবী জা‌নি‌য়ে‌ছি‌লেন।

জয়‌বি‌ডিজয়‌বি‌ডি
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  12:40 PM, 12 May 2021
২০০৭ সা‌লে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকা‌রের হা‌তে আটক শেখ হা‌সিনার মু‌ক্তি দাবী ক‌রেন খা‌লেদা জিয়া। - সমকাল (১৯ জুলাই ২০০৭) এ প্রকা‌শিত।

২০০৭ সা‌লে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকা‌রের হা‌তে আটক শেখ হা‌সিনার মু‌ক্তি দাবী ক‌রেন খা‌লেদা জিয়া।
– সমকাল (১৯ জুলাই ২০০৭) এ প্রকা‌শিত।

শেখ হাসিনার এই ছবিটি দেখতে ভালো লাগেনা। খুব অশোভন ও অসম্মানজনক দৃশ্য। কেননা তিনি বর্তমানে এ দেশের প্রধানমন্ত্রী। তা সে যেভাবেই হয়ে থাকুন না কেন। তাছাড়া অতীতে তিনি বৈধপন্থায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী হয়েছিলেন। পুরনো একটা মস্ত রাজনৈতিক দলের শীর্ষনেতৃত্বে আসীন তিনি। তিনি অন্যদের প্রতি যত অসদাচরণই করে থাকুন না কেন, সেটা তার রুচি ও বোধের ব্যাপার। আমাদের রুচিবোধ, সংষ্কৃতি ও ন্যায়পরায়নতা কারো প্রতি অন্যায্য আচরণেই তুষ্ট হয়না। এমনকি সে যদি চরম শত্রুও হয়।তবে এ ছবিটি আমাদের ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। এই আলোকচিত্রটি একটি প্রামাণ্য দলিল ও রেকর্ড।

এই বিবৃতি প্রকাশের পর রিপোর্টাররা এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের তখনকার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিল্লুর রহমানের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন: তিনি (বেগম জিয়া) একজন মহান নেত্রী এবং একজন মহান নেত্রীর মতই তিনি তাঁর স্টেটমেন্ট দিয়েছেন। ম্যাডাম খালেদা জিয়া বরাবরই খুবই মিতবাক মানুষ। তিনি কখনো কোনো ব্যাপারে অতি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন না। সেই মানুষটিই বিবৃতিটি প্রকাশের পর আমাকে ফোন করে বললেন: আমি যেমন চেয়েছিলাম ঠিক তেমনই হয়েছে। থ্যাংক ইউ। খুব সুন্দর হয়েছে।

আজ ১৬ জুলাই। বাংলাদেশে ফখরুদ্দীন-মঈনুদ্দীনের জরুরি সরকারের জামানায় ২০০৭ সালের আজকের তারিখেই শেখ হাসিনাকে তিন কোটি টাকা চাঁদাবাজির দায়ে অভিযুক্ত করে দায়ের করা মামলায় রাতের বেলা গ্রেফতার করা হয়। তাকে আদালতে হাজির করানো হলে আদালত প্রাঙ্গনে এ ধরণের অসৌজন্যমূলক দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। আদালত জামিনের আবেদন না-মঞ্জুর করে তাকে জেল হাজতে পাঠিয়ে দেয়। পরদিন সব সংবাদপত্রে এর ওপর সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। বেগম খালেদা জিয়াও তখন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের শহীদ মইনুল রোডের বাসায় অন্তরীণ। অঘোষিত এই গৃহবন্দীত্বের কালে তাঁর বাসা থেকে বেরুনো এবং বাসায় বাইরের কারো প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে বিভিন্ন নম্বরের সিম থেকে আমরা তখনো সেলফোনে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারছিলাম। এর আগে সার্বিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে জনগণ ও সশস্ত্রবাহিনীর উদ্দেশে ম্যাডাম জিয়ার একটি বিবৃতি আমি উনার নির্দেশক্রমে গণমাধ্যমে দিই। সেই বিবৃতি দেশী-বিদেশী প্রচারমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারিত হয়। সে সময় ১/১১-এর সমর্থক এবং বিএনপি-বিদ্বেষী বিভিন্ন সংবাদ-মাধ্যম অতিউৎসাহী হয়ে জনাব আব্দুল মান্নান ভুইয়া এবং সংষ্কারবাদী অন্য নেতাদের কাছ থেকে সেই বিবৃতির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া সংগ্রহ করে। তারা সকলেই আমার বিরোধিতা করে সংবাদ-মাধ্যমকে বলেন, মারুফ কামাল খান বিএনপির কেউ নন। তিনি কোনো রাজনীতিবিদ নন, সাংবাদিক মাত্র। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকতে মারুফ কামাল খান তাঁর প্রেস উইংয়ে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে বেগম জিয়া আর প্রধানমন্ত্রী নন, মারুফ কামাল খানও এখন তাঁর নামে বিবৃতি দেয়ার এখতিয়ার রাখেন না। কেউ একজন বেগম জিয়ার নামে বিবৃতি দিলেই সেটা বেগম জিয়ার বিবৃতি হয়ে যায় না।

এরপর আমাকে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা অফিসে নিয়ে একজন খুব পাওয়ারফুল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দিনভর আটকে রেখে জেরা করেন। নরমে গরমে নানান হুমকি ও নির্দেশনা দিয়ে সন্ধ্যায় আমাকে ছাড়া হলেও আমি তখনকার সরকার ও জেনারেল মঈন সহ কোনো কোনো পদস্থ সেনা অধিকর্তার খুবই কোপদৃষ্টিতে ছিলাম। আমি বিভিন্ন সূত্রে পরে জেনেছিলাম, বিবৃতিটি হাতে পেয়েই দু’জন সম্পাদক জেনারেল মঈনকে ফোন করে বলেছিলেন, এটি একটি গুরুতর বিবৃতি এবং আমি সরকারের জন্য ভয়ঙ্কর ক্ষতিকারক একজন লোক। তাদের কথায় মঈন খুব উত্তেজিত হয়ে আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলে। সেই দুই সম্পাদক এখন অবশ্য প্রবল আওয়ামী ভূমিকায় অবতীর্ণ।যা-হোক, ম্যাডাম জিয়া এরপর এক টেলিকনফারেন্সে নিজে থেকেই বলে দেন যে, মারুফ কামাল খান আমার নির্দেশেই সংবাদ-মাধ্যমে ঐ বিবৃতি পাঠিয়েছেন এবং সাংবাদিকতার পাশাপাশি আমার প্রেসসচিব হিসেবে আমি তাকে দায়িত্ব দিয়েছি। এরকম নাজুক সময়ে যায়যায়দিন প্রতিদিন-এর চাকরি ছেড়ে আমি তখন ম্যাডামের নির্দেশেই দৈনিক দিনকাল অফিসে বসি। ১৮ জুলাই দুপুরের দিকে আমাকে ফোন করে ম্যাডাম জিজ্ঞেস করলেন: ছবিটা দেখেছেন? আমি প্রথমে বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম: কোন ছবি ম্যাডাম?উনি বললেন: আপনার সামনে আজকের পেপার নাই? প্রথম পৃষ্ঠাতেই তো ছেপেছে সবাই।বুঝতে পেরে বললাম: শেখ হাসিনার ছবির কথা বলছেন তো? জ্বী ম্যাডাম দেখেছি।
তিনি বললেন: এটা কি ঠিক হয়েছে? তার সঙ্গে এমন আচরণ করা চলে? সে এক্স প্রাইম মিনিস্টার এবং এক্স অপজিশন লিডার। একটা বিরাট পলিটিক্যাল পার্টির চিফ। একজন ন্যাশনাল লিডারের মেয়ে। একজন সিনিয়র সিটিজেন এবং সবকিছুর উপরে একজন ডিগনিফায়েড লেডি। এই আচরণ কি সে ডিজার্ভ করে? খুব কুৎসিত আচরণ করেছে। আমার খুব খারাপ লেগেছে ছবিটা দেখেই। এটা মোটেও ঠিক হয়নি। এখন মিলিটারি ব্যাকড গভর্নমেন্ট। আর্মিতে মেয়েদেরকে একটা আলাদা সন্মানের চোখে দেখা হয়। এরা কি সেই কালচারটাও নষ্ট করে ফেলবে? আমি চুপ করে ম্যাডামের কথাগুলো শুনছিলাম। আর ভাবছিলাম, হায় রে এমন একজন মানুষ! অথচ বাইরে কিছু লোকের কাছে কতটা মিসআন্ডারস্টুড তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে কত বৈরি ও নষ্ট প্রচারণা!আমার মনে পড়ছিল, জরুরি অবস্থা জারির পর বিদেশ সফরে যাবার আগে শেখ হাসিনা এই সরকারকে তার আন্দোলনের ফসল বলেছিলেন।

আগাম ঘোষণা দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় এলে তাদের সব কাজের বৈধতা দেবেন। রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও গ্রেফতারকে সমর্থন করে তারেক রহমানের দিকে ইংগিত করে বলেছিলেন: ‘বড় চোরটাকে কিন্তু এখনো ধরা হয়নি।’ এরপর তারেক রহমান গ্রেফতার করা হয় এবং দেশে ফেরার পর তিনি নিজেও দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার হয়ে গেলেন।
আমাকে চুপ থাকতে ম্যাডাম বোধ হয় ভাবলেন, আমি তাঁর কথায় কনভিন্স হইনি। তাই আবার নিজে থেকেই বলতে শুরু করলেন: হ্যাঁ, তার ভাষা খুব খারাপ। আমার, জিয়াউর রহমানের এবং আমাদের পরিবারের বিরুদ্ধে অনেক আজেবাজে কথাই সে বলে। সেগুলো আমার যেমন খারাপ লাগে ঠিক তেমন কষ্টই পেয়েছি তার প্রতি যে অসদাচরণ করা হয়েছে তা’ দেখে। শোনেন, এ-ধরণের আচরণের নিন্দা করে এবং তার মুক্তির দাবি জানিয়ে আমার নামে আজই একটা স্টেটমেন্ট দিয়ে দেন।
আমি প্রশ্ন করলাম: মুক্তির দাবিও জানাবো? বললেন: কেন নয়? সে তো আর পালিয়ে যাবে না। তাকে জামিনে মুক্ত রেখেও তো মামলা চালানো যায়। একটু থেমে বললেন: দেখেন, এগুলো কোনো মামলা? করতে হয় করেছে। জোর করে কাউকে দিয়ে অভিযোগ আনানো কোনো ব্যাপারই নয়। উদ্দেশ্য, হেনস্তা করা। শেখ হাসিনার পর তো আমরা সরকারে ছিলাম। কৈ তখন তো কেউ এই অভিযোগ নিয়ে আসেনি। আসলে একটা সমস্যাসংকুল গরীব দেশে আমরা রাজনীতি করি, সরকার চালাই। চারদিকে এতো সংকট, এতো সমস্যা। যাদের ওপর নির্ভর করে বা আস্থা রেখে কাজ করি তাদের যোগ্যতার সীমাবদ্ধতা আছে। সকলের সমান কমিটমেন্ট ও সততাও নেই। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি। এর মধ্যে মাথা ঠিক রেখে কাজ করাই কঠিন। তাই কাজ করতে গিয়ে ভুলত্রুটি হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। এই বাস্তব অবস্থাগুলো বিবেচনায় রাখা দরকার। যাই, হোক আপনি আমার স্টেটমেন্টটা আজই দিয়ে দেন।
অন্যান্য বিষয়ে আরো কয়েকটি কথা বলে ম্যাডাম ফোন রাখলেন। আমি বিবৃতিটি লিখে কম্পোজ ও প্রিন্ট করিয়ে দেশী-বিদেশী সব সংবাদমাধ্যমে বার্তাপ্রেরক হিসেবে সই করে পাঠালাম। উনি যা যা বলেছেন, মোটামুটি সেই কথাগুলোই গুছিয়ে লিখলাম বিবৃতিতে। সন্ধ্যার মধ্যে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াগুলোতে সেটি প্রচারিত হবার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেল পদস্থ কর্তাদের ভয়ঙ্কর তৎপরতা।

ব্যক্তিগত সে-সব হেনস্তা ও পরিস্থিতি সামলাবার বিভিন্ন কৌশল সম্পর্কে এখানে বিস্তৃত বিবরণ দেয়ার অবকাশ নেই। পরে যদি কখনো সুযোগ হয় তখন সে-সব ঘটনা নিয়ে আলাদা লেখা লিখবো হয়তো। ম্যাডামের এই বিবৃতিটি নিয়ে খুব প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। বিদেশী মিডিয়া অনেকদিন ধরেই দুই নেত্রীকে ‘ব্যাটলিং বেগমস’ এবং ‘জাত শত্রু’ বলে প্রচার চালাচ্ছিল। এদের দ্বন্দ্বে দেশ শেষ হয়ে যাচ্ছে। এখান থেকেই ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার উদ্ভব। কিন্তু সেই কথিত ‘জাতশত্রু’র বিপদে তার প্রতি বেগম জিয়ার সমর্থন ও জলপাই শাখা এগিয়ে দেয়ার ঘটনায় সবাই নড়েচড়ে বসে। এটিকে কেন্দ্র করে দেশী-বিদেশী বিশ্লেষকরা এদেশের রাজনৈতিক রসায়নের নতুন বিন্যাস ও সমীকরণের আভাস দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক খেলোয়াড়দের পরিকল্পনার ছক নতুন করে সাজাতে হয়েছিল। ওয়ান-ইলেভেন ওয়ালাদের মাইনাস টু ফর্মুলা বাদ দিয়ে সেফ এক্সিটের ডিফেন্সিভ প্ল্যান আঁটতে হয়েছিল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শক্তিযুথের নতুন সমীকরণে এর পুরো সুফল পেয়েছেন একা শেখ হাসিনা। কিন্তু তিনি তার কতটা সদ্ব্যবহার করেছেন অনাগত ইতিহাস তার নির্মোহ রায় দেবে। এই বিবৃতি প্রকাশের পর রিপোর্টাররা এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের তখনকার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিল্লুর রহমানের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন: তিনি (বেগম জিয়া) একজন মহান নেত্রী এবং একজন মহান নেত্রীর মতই তিনি তাঁর স্টেটমেন্ট দিয়েছেন। ম্যাডাম খালেদা জিয়া বরাবরই খুবই মিতবাক মানুষ। তিনি কখনো কোনো ব্যাপারে অতি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন না। সেই মানুষটিই বিবৃতিটি প্রকাশের পর আমাকে ফোন করে বললেন: আমি যেমন চেয়েছিলাম ঠিক তেমনই হয়েছে। থ্যাংক ইউ। খুব সুন্দর হয়েছে।

লেখক- মারুফ কামাল খান।

আপনার মতামত লিখুন :