যেসব কার‌নে ‌বি‌দেশী অপরাধী‌দের তা‌দের দেশে পাঠা‌নো যা‌চ্ছে না।

জয়‌বি‌ডিজয়‌বি‌ডি
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  02:27 PM, 15 February 2021

বৈধভাবে বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে এসে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে অনেক বিদেশি নাগরিক। এদের মধ্যে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা নাগরিকের সংখ্যাই বেশি। অনেককে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানোর পরও বিভিন্ন জটিলতায় ফেরত পাঠানো যাচ্ছে না নিজ দেশে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, পাঁচ শতাধিকের বেশি বিদেশি নাগরিক আছে, যাদের বার বার ফেরানো চেষ্টা করেও কোনও সুরাহা হচ্ছে না। অনেকের পাসপোর্ট ও ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে। নেই অন্য কাগজপত্রও।

র‍্যাব-সিআইডি সূত্র বলছে, দেশে অপরাধ করা এসব বিদেশিদের বিরুদ্ধে প্রায় দুই শতাধিকের বেশি মামলা রয়েছে। কিছু নিষ্পত্তি হয়েছে। কিছু ঝুলে আছে। ফলে অনেক অপরাধীকে বছরের পর বছর রাখতে হচ্ছে কারাগারে।

র‍্যাব বলছে, ২০০৮ সাল থেকে এ বছরের ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন অপরাধে ২১১ বিদেশিকে গ্রেফতার করেছে সংস্থাটি। সিআইডি বলছে, গত বছরেই ধরা পড়েছে প্রায় ৬০ জন।

দেশে অবস্থানকারী বিদেশি নাগরিকদের নজরদারিতে রাখার কাজ করে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি)। তাদের হিসাব অনুযায়ী, গতবছর পর্যন্ত দেশে অবৈধভাবে অবস্থানকারী বিদেশি নাগরিক ছিল ১২ হাজার ৮০৫ জন। এর মধ্যে সবেচেয়ে বেশি আছে ভারতীয়। এরপরই আছে দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের নাগরিকরা। যাদের কেউ ভ্রমণ ভিসায়, কেউ ব্যবসায়িক ভিসায়, কেউ অন অ্যারাইভাল ভিসায় এ দেশে এসে অবৈধভাবে রয়ে গেছেন। এদের পাসপোর্ট, ভিসার মেয়াদও ফুরিয়ে গেছে। অনেকে জড়িয়ে পড়েছিলেন সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রে।

এসবির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের অনেককে গ্রেফতারের পর দেখা যায়, তাদের কাছে পাসপোর্ট নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা ইচ্ছে করেই পাসপোর্ট গোপন করে। এ অবস্থায় তাকে কোন দেশে পাঠানো হবে তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তদন্তের সময় যায় প্রচুর। এমন অনেক দেশের দূতাবাসও নেই বাংলাদেশে। এ অবস্থায় আটককৃত ব্যক্তির নাগরিকত্ব যাচাই ও ভ্রমণ সংক্রান্ত নথিপত্র সংগ্রহ করাও সময়সাপেক্ষ। আবার দূতাবাস থাকলেও দেখা যায় তারা সব সময় সহযোগিতা করে না।

ওই প্রতিবেদনে এসবি আরও বলেছে, ফরেন অর্ডার ১৯৫১–এর ১৪ ধারা অনুযায়ী প্রত্যাবাসন ও অবস্থানের খরচের কথা বলা আছে। নিজের দেশের ফেরত পাঠানোর আগপর্যন্ত অবৈধ অভিবাসীকে ‘সেফ হোমে’ রাখার ব্যবস্থা ও উড়োজাহাজের টিকিটসহ যাবতীয় ব্যয় বহন করার জন্য অভিবাসন পুলিশের কাছে বরাদ্দ রাখার কথাও আছে। কিন্তু দেশে সেফ হোম নেই। প্রত্যাবাসন বাবদ বরাদ্দও নেই।

বিদেশি অপরাধীদের দেশে পাঠানোর বিষয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক ব্যারিস্টার মাহবুবুর রহমান জয়‌বি‌ডি২৪.কম’‌কে বলেন, ‘অপরাধীদের পাঠানোর ক্ষেত্রে বিশেষ কোনও জটিলতা নেই। আমরা চাইলে তাদের রাখতেও পারি, আবার পাঠাতেও পারি। তবে দেখতে হবে তাদের স্ট্যাটাসটা কেমন। অনেককে আমরা দেখি বৈধভাবে আসে বৈধভাবেই থাকে। কিন্তু তারা ক্রাইমের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। তখন চাইলেও তাদের নিজ দেশে পাঠাতে পারি না। দেশের আইন আনুযায়ী শাস্তি হয়। যখন দেখি কোনও নাগরিক শুধু অবৈধভাবে অবস্থান করছেন এবং কোনও কাগজপত্র নেই, তখন তাকে জটিলতা ছাড়া ফেরত পাঠাতে পারি।’

বি‌দেশীরা যে ধর‌নের অপরাধে জ‌ড়ি‌য়ে পড়‌ছেঃ

র‍্যাব-পুলিশ সূত্র বলছে, বিদেশি অপরাধীদের বেশিরভাগ অপরাধই প্রতারণা ও জালিয়াতি সংক্রান্ত। প্রতারণাসহ বিভিন্ন অভিযোগে গত কয়েক মাসে আফ্রিকার আটটি দেশের অর্ধশতাধিক নাগরিককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ ছাড়া ব্যাংকের ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ড জালিয়াতি করে এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন ইউক্রেনের ছয় নাগরিক। মানবপাচার, মাদক, চোরাচালান, জাল টাকা ইত্যাদিসহ নানা অপরাধের সঙ্গেও তারা জড়িত বলে জানা গেছে। শুরুর দিকে এসব আন্তর্জাতিক চক্র ডলার দ্বিগুণ করার নামে প্রতারণা করত। কয়েক বছর ধরে বিদেশ থেকে ‘উপহার’ পাঠানোর নামে এবং ফেসবুকে অন্যের আইডি হ্যাক করে সেখানে থাকা বন্ধু তালিকার লোকজনকে ফাঁদে ফেলেও প্রতারণা করছে তারা।

সম্প্রতি ফেসবুকের মাধ্যমে প্রতারণা করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ১২ বিদেশিকে গ্রেফতার করেছে বাংলাদেশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ সময় তাদের সহযোগী এক বাংলাদেশিকেও গ্রেফতার করা হয়। সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ রেজাউল হায়দার জানান, বেশ কয়েক মাস ধরে এই প্রতারকরা ফেসবুকের প্রতারণা করে আসছে। এভাবে তারা পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকা হাতিয়েছে।

সামা‌জিক যোগা‌যোগ মাধ্যম ফেসবুকে যেভাবে প্রতারণা করছেঃ

প্রথমে প্রতারক বিদেশি নাগরিক তার টার্গেট করা ব্যক্তির সঙ্গে ফেসবুকে বন্ধুত্ব করে। এক পর্যায়ে একটি ম্যাসেঞ্জার আইডি থেকে উপহার পাঠানোর প্রস্তাব দেয়। পরে ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে ওই উপহার বুকিং করার ভুয়া নথিপত্র পাঠায়। প্রতারকরা জানায়, গিফট বক্সে মূল্যবান সামগ্রী রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট এয়ারপোর্টের কাস্টমস গুদাম থেকে সেটা গ্রহণ করতে হবে। পরে ওই বিদেশি প্রতারক সাহায্য নেয় তার বাংলাদেশি সহযোগীর। সেই সহযোগী নিজেকে কাস্টমস কমিশনার পরিচয় দিয়ে যোগাযোগ করে ভিকটিমের সঙ্গে। পারসেলের শুল্ক বাবদ মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যাংকে জমা দিতে বলে ওই ভুয়া কমিশনার। আবার উপহার গ্রহণ না করলে আইনি জটিলতার ভয়ও দেখানো হয়। ফেসবুকের আশ্রয় নিয়ে এ ধরনের প্রতারণাই বেশি ঘটছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।

সিআইডি প্রধান ব্যারিস্টার মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের দেশের অনেকেই সরল প্রকৃতির। তাদের বোকা বানাচ্ছে কিছু অপরাধী। আমি অনুরোধ করবো, এমন ঘটনার মুখে পড়লে আমাদের সংস্থাগুলোর সঙ্গে যেন যোগাযোগ করে। লোভে পড়ে যেন হুট করে কাউকে টাকা না দেয়।’

আপনার মতামত লিখুন :