মিশরে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একমাত্র প্রেসিডেন্ট মুহাম্মাদ মুরসি ইন্তেকাল করেছেন।

নিজস্ব প্রতিবেদকনিজস্ব প্রতিবেদক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  01:16 AM, 18 June 2022

মিশরে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একমাত্র প্রেসিডেন্ট মুহাম্মাদ মুরসি ইন্তেকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন।সোমবার (১৭ জুন) ৬৭ বছর বয়সী মুহাম্মাদ মুরসি দেশটির আদালতের এজলাসেই ইন্তেকাল করেন।

মিসরের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন মিসরের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে । মিসরের রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হয়, সাবেক প্রেসিডেন্ট বিচারকের কাছে কথা বলার অনুমতি চাইলে তাকে কথা বলতে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এ সময় তিনি বুকে ব্যাথা অনুভব করেন। এক পর্যায়ে তিনি হার্টঅ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

খবরে বলা হয়, মুরসির লাশ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেখানে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।মুরসির ছেলে আহমদ নাজাল ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তিনি লেখেন, আমার পিতা আল্লাহর কাছে চলে গিয়েছেন। উল্লেখ্য, ২০১১ সালে আরব বসন্তের জেরে মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারকের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে বিশাল গণঅভ্যুত্থান। এতে পদচ্যুত হন হোসনি মোবারক।
এরপর মিসরের প্রথম অবাধ ও গণতান্ত্রিক নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন ব্রাদারহুডের মুরসি। কিন্তু ২০১৩ সালে গণঅসন্তোষের সুযোগ নিয়ে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে মিসরীয় সেনাবাহিনী। পরে প্রেসিডেন্টের মসনদে বসেন মুরসির হাতে সেনাপ্রধান হওয়া আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি।
২০১৩ সালে মুরসির নেতৃত্বাধীন মুসলিম ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ করা হয়। এর হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয় এবং বিভিন্ন অভিযোগে অনেককে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া হয়। মুরসির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি অর্থের বিনিময়ে কাতারের কাছে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও নথি পাচার করেছেন।
২০১৪ সালে তার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনা হয়েছিল। এরপর ২০১৬ সালের জুন মাসে তথ্য পাচারের এ মামলায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করেন নিম্ন আদালত। আদালত দেশের গুরুত্বপূর্ণ নথি পাচারের অভিযোগে মুরসিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন।

কে এই মুরসি?

১৯৫১ সালের ২০ আগস্ট মিসরের শারক্বিয়া প্রদেশে জন্ম নেয়া মুহাম্মাদ মুরসি ইসা আল-আইয়াত কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকৌশল বিষয়ে ১৯৭৫-৭৮ সালে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ ক্যালিফোর্নিয়াতে প্রকৌশল বিষয়ে গবেষণাত্তোর ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। অতঃপর ক্যালিফের্নিয়ার স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্ম জীবন শুরু করেন।

১৯৮৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করে নিজ জন্মভূমি শারক্বিয়া প্রদেশের জাগাজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের উদ্দেশে মিসর ফিরে আসেন।

মুরসি ২০০০ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সে সময় রাজনৈতিকভাবে রাষ্ট্র কর্তৃক মুসলিম ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ থাকায় মুরসি মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য হলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই তাকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হয়।

২০১১ সালে ব্রাদারহুডের আদলে ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি (এফজেপি) গঠন করে পার্টির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মুরসি।

২০১২ সালে মিসরে দুই পর্বে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। উভয় পর্বে ড. মুরসি পর্বেই সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে মুরসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ফলাফল ঘোষণার পর ব্রাদারহুড ও এফজেপি থেকে তাকে অব্যাহতি দিয়ে মিসরের সর্বস্তরের মানুষের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

অবশেষে সব উদ্বেগ ও শঙ্কা থেকে মিসরসহ বিশ্ববিবেককে মুক্তি দিয়ে মৃত্যুর মাধ্যমে শাহাদাতকেই বেছে নিলেন মজলুম জননেতা ড. মুহাম্মাদ মুরসি ইসা আল-আইয়াত।

ড. মুরসির মৃত্যুতে বিশ্বগণমাধ্যমসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, নেতা ও সংস্থার আবেগঘন বিবৃতি ও শোকে মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সরব। বাদ যায়নি সাধারণ মানুষের আবেগঘন স্ট্যাটাস।

কাতারের আমিরের শোক
কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি তার নিজ ভ্যারিফায়েড টুইটার অ্যাকাউন্ডে শোক জানিয়ে লিখেন-

‘মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মুহাম্মাদ মুরসির হঠাৎ মৃত্যুর খবর পেয়ে অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছি। তার পরিবার ও মিসরবাসীর জন্য সমবেদনা জানাই। নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং তার কাছে সবাইকে ফিরে যেতে হবে।’

তুরস্কের প্রেসিডেন্টের শোক
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইপে এরদোয়ান ড. মুরসির মৃত্যুতে সাংবাদিক প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বলেন-
‘গাড়ি থেকে নামার সময় আমার কাছে মুরসির মৃত্যুর খবর আসে। আমরা আল্লাহর কাছে আমাদের শহিদ ভাইয়ের জন্য দোয়া করছি, আল্লাহ যেন শহিদের ওপর রহম করেন। আদালতের এজলাসেই তার মৃত্যু হয়েছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি আল্লাহর কাছে তার জন্য রহমত কামনা করি।’

ব্রিটিশ এমপি প্যানেলের বিবৃতি
যথাযথ চিকিৎসা সেবা না দেয়ায় মুরসির অকাল মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন ব্রিটিশ রাজনীতিক ও আইনজীবীদের একটি প্যানেল। তারা বলেন-

‘দীর্ঘদিন ধরে অবহেলার ফলে মুরসির শারীরিক অবস্থা যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে তিনি অকালে মারা যেতে পারেন। মিসরের বর্তমান সরকার মুরসির ব্যাপারে এসব বক্তব্যকে মোটেও গুরুত্ব দেয়নি।
মৃত্যুর আগে তার পরিবারসহ বিভিন্ন মহল থেকেই সরকারি কর্তৃপক্ষকে মুরসির শারীরিক অবস্থা মোটেও ভালো নয় বলে জানানো হয়েছিল। এ অবহেলায় কারাগারে তার মৃত্যু হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছিল। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মুরসিকে যথাযথ চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে বলে বারবার তার পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল। যার কোনো গুরুত্ব দেয়নি সরকার ও কর্তৃপক্ষ। যার ফলশ্রুতিতে মুরসিকে অকালে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে।

মুসলিম ব্রাদারহুডের বিবৃতি
মিসরের জনপ্রিয় মুসলিম সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুড ড. মুরসির মৃত্যুতে সরকারের অবহেলা ও দায়িত্বশীলতার অভাব উল্লেখ করে বলেন-

ড. মুহাম্মাদ মুরসিকে ক্রমান্বয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। গ্রেফতার ও পরবর্তীতে জিজ্ঞাসাবাদ শুরুর পর থেকেই মুরসির শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে থাকে এবং এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার মিসরের আদালতে বিচার চলাকালীন সময়ে তার মৃত্যু হয়।

ব্রিটিশ ইন্ডিপেনডেন্ট ডিটেনশান রিভিউ প্যানেলের বিবৃতি
ড. মুরসির মৃত্যুতে চরম অবহেলার অভিযোগ করে ব্রিটিশ ইন্ডিপেনডেন্ট ডিটেনশান রিভিউ প্যানেল। তারা বলেন-

‘সাবেক এ প্রেসিডেন্টকে কারাবন্দি রাখার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। তার প্রতি অবহেলার কারণে মৃত্যু আগেই ক্ষমতাসীন আবদেল ফাত্তাহ আল সিসিকেও দায়ী করেছিল যুক্তরাজ্যের বিশেষ স্বাধীন বন্দিত্ব পর্যালোচনা প্যানেল ইনডিপেনডেন্ট ডিটেনশান রিভিউ প্যানেল।
তারা সহ আন্তর্জাতিক কয়েকটি সংস্থা আগেই মিসর সতর্ক করে বলেছিল যে, মুরসি কারাগারে অকালে মারা যেতে পারেন। কারণ তার প্রতি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে মিসর সরকার।

মিসরের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে মুরসির মৃত্যুর সংবাদ
মিসরের রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হয়, সাবেক প্রেসিডেন্ট বিচারকের কাছে কথা বলার অনুমতি চাইলে তাকে কথা বলার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। এ সময় তিনি বুকে ব্যথা অনুভব করেন। এক পর্যায়ে তিনি হৃদক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
খবরে আরও বলা হয়, মুরসির লাশ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।