বিএনপিকে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি সাতটি প্রস্তাবনা দিয়েছে।

rahadrahad
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  02:29 AM, 02 June 2022

বিরোধী ভাবমুর্তির ছোট ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আন্দোলন ইস্যুতে একের এক বৈঠকে বসতে শুরু করছে বৃহত্তর রাজনৈতিক দল বিএনপি। এবার তৃতীয়ধাপে গণসংহতি আন্দোলনের সাথে বসেছে দলটি।

বৈঠকে বিএনপিকে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি সাতটি প্রস্তাবনা দিয়েছে। এদিকে গণসংহতির সাত প্রস্তাবে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

মঙ্গলবার (৩১ মে) রাজধানীর হাতিরপুলে গণসংহতির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দীর্ঘ ২ ঘণ্টার বৈঠকে গণসংহতির প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বিএনপির প্রতিনিধি দলের কাছে সাত দফা প্রস্তাবনা প্রদান করেন।বৈঠক শেষে গনমাধ্যমে প্রস্তাবের ব্যাপারে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব।

সংলাপ শেষে সাংবাদিকদের মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, একটা গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে, গণ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশের সমস্ত মানুষকে একতাবদ্ধ করে, রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ করে আমাদেরকে এই ভয়াবহ যে ফ্যাসিবাদী সরকারকে সরিয়ে সত্যিকার অর্থেই একটা জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা একমত হয়েছি। যুগপৎ আন্দোলনের ব্যাপারে আমরা একমত হয়েছি। যে বিষয়গুলোতে আমরা একমত হয়েছি তা হচ্ছে- এই সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে, সংসদ বাতিল করতে হবে। সংসদ বাতিল করে আমরা যেটা বলেছি, একটা নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করতে হবে। তাদের অধীনে নির্বাচন কমিশন গঠন হবে এবং তাদের মাধ্যমে নির্বাচন হবে। সেই নির্বাচনের মাধ্যমেই ভবিষ্যতে পার্লামেন্ট ও সরকার গঠিত হবে।

ফখরুল বলেন, আমরা আশাবাদী আজকের আলোচনা অত্যন্ত ফলপ্রসু হয়েছে। এই আলোচনা অব্যাহত থাকবে। আমরা বিশ্বাস করি, অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা যেটা শুরু করেছি সেটা অতি দ্রুত শেষ করে একটা যৌক্তিক পর্যায় এসে পৌঁছাতে পারবো এবং এই সরকার যারা আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ধবংস করছে, যারা আমাদের মানুষের আশা-আকাঙ্খাগুলোকে হত্যা করছে তাদের বিরুদ্ধে একটা ফলপ্রসু আন্দোলন করে এতে জয়যুক্ত হতে সক্ষম হবো।

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, আমাদের দলের পক্ষ থেকে এটা স্পষ্টভাবে মনে করি, বর্তমান সরকারের পতনের জন্য আন্দোলন দরকার এবং এইভাবে যদি একটা জাতীয় রুপরেখা আজকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো কাছে থেকে হাজির হয় জনগন নতুন করে আন্দোলিত হবে। একটা বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলে বর্তমান সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করতে পারবো। সেজন্য আমরা প্রাথমিকভাবে ঐক্যমত হয়েছি যে, যুগপৎ ধারায় আন্দোলন, যার যার অবস্থান থেকে পরিচালনা করতে হবে।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দেশের মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে ১৮ কোটি মানুষকে এককাতারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে এবং এরা প্রত্যেকেই ভোটাধিকারের দাবিতে আজকে নিজেরা আন্দোলন করবেন। একটা জাতীয় ঐক্যের জায়গায় সরকার যেহেতু দাঁড় করিয়ে দিয়েছে-এই জাতীয় আন্দোলন আগামীদিনে সকলে নিজের অবস্থান থেকে সাধ্যমত করবেন। এরমধ্যে কিভাবে সমন্বয় গড়ে তোলা যাবে সেই সমন্বিত যুগপৎ ধারার বিষয়ে আমরা আলোচনা করেছি, এবং ভবিষ্যতেও এ বিষয়ে আরো আলোচনা হবে। এর মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে একটা কাঠামো একটা রুপরেখা নিশ্চিতভাবে সামনে আসবে।

গণসংহতির দেওয়া সাত দফা প্রস্তাবনা গুলো হলো

১. আইন বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করা। উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের জন্য স্বচ্ছ পরীক্ষা পদ্ধতি এবং জেষ্ঠ্যতা লংঘন না করার কঠোর নীতিমালা প্রনয়ণ। নিম্ন আদালতের নিয়োগ , বদলি , পদোন্নতিসহ সার্বিক কার্যক্রম তদারকির ক্ষমতা উচ্চ আদালতের অধীনস্ত করা। সকল গণবিরোধী , নাগরিক অধিকার খর্বকারী , উপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে সৃষ্ট আইন যা এখনো বলবৎ আছে সেসব আইন বাতিল করে একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও স্বাধীন দেশের উপযোগী আইনকানুন ও আইনী কাঠামো তৈরি। আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের জবাবদিহিতা নিশ্চিতের জন্য আইন প্রণয়ন।

২. সমস্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান যেমন নির্বাচন কমিশন , অ্যাটর্নি জেনারেল, মহা হিসাব – নিরীক্ষক , পাবলিক সার্ভিস কমিশন , মানবাধিকার কমিশন , দুর্নীতি দমন কমিশন ইত্যাদিতে সাংবিধানিক কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগ পদ্ধতি প্রনয়ণের জন্য প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার করা। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে গঠিত সংসদের সরকারীদল , বিরোধীদল ও বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের দ্বারা এই কমিশন গঠিত হবে ।

৩ . রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানের মধ্যে ক্ষমতার পৃথকীকরণ ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট বিধান প্রণয়ন। সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন ও প্রাদেশিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার ।

৪ . সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থার প্রবর্তন। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রচারণায় টাকার খেলা , পেশী শক্তি , প্রশাসনিক কারসাজি , সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ব্যবহারের পথ বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় আইনী সংস্কার।

৫. সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার করে সংসদ সদস্যদের ( কেবলমাত্র সরকার গঠনে আস্থা ভোট ও বাজেট পাশে ভোট প্রদান ব্যাতিরেকে) স্বাধীনভাবে জনগণের প্রতিনিধিত্ব ও সকল বিলে ভোট প্রদানের অধিকার নিশ্চিত করা। সরকার ও দলের ক্ষমতাকে পৃথকীকরণে আইন প্রনয়ণ।

৬. বিদ্যমান সংবিধানের ‘ স্থানীয় শাসন ব্যবস্থার বদলে স্থানীয় সরকারব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা এবং স্থানীয় সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড , আইন শৃক্ষলা , শিক্ষা , স্বাস্থ্য ও নাগরিক সেবা এবং এর প্রয়োজনীয় বাজেট প্রণয়ন , কর সংগ্রহ ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার।

৭. দেশের সমস্ত অর্থনৈতিক ও ব্যবস্থাপনাগত আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রাণ – প্রকৃতির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আইনী বিধান। জাতীয় সম্পদ ব্যবহার ও জাতীয় নিরাপত্তা ব্যতীত সকল আন্তর্জাতিক চুক্তি সংসদে আলোচনা বাধ্যতামূলক করা। মুক্তিযুদ্ধের ঘোষিত অঙ্গীকার অনুযায়ী দেশের সকল নাগরিকের জন্য সাম্য , মানবিক মর্যাদা , সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আইনী সুরক্ষা এবং ধন , বণ , ভাষা ও লিঙ্গীয় পরিচয় নির্বিশেষে সকল নাগরিকের জীবন সম্পদ মর্যাদার নিরাপত্তা বিধান।

এসময় বৈঠকে বিএনপির পক্ষ থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমির খসরু মাহমুদ ও জহির উদ্দিন স্বপন এবং ইকবাল মাহমুদ টুকু উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে গণসংহতি আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, নির্বাহী সমন্বয়ক আবুল হাসান রুবেল ও রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য তাসলিমা আখতারসহ অনেকেই।

এর আগে গত ২৪শে মে নাগরিক ঐক্য এবং ২৭শে মে বাংলাদেশ লেবার পার্টির সঙ্গে সংলাপ করেছে বিএনপি।