চূড়ান্ত পর্যায়ে সবাইকে একদফার আন্দোলনে আসতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদকনিজস্ব প্রতিবেদক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  04:29 AM, 25 July 2022

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জাতীয় জীবনে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে। এর একটি হলো অর্থনৈতিক সংকট। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য সরকার এটি ধামাচাপা দেবার চেষ্টা করছে এবং উন্নয়নের ফাঁপা বেলুন উড়িয়েই চলেছে। দৃশ্যমান কিছু মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার জাতিকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু জাতি আজ জাগতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, অতীতের মতো কঠিন আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে এবং দল নিরপেক্ষ সরকারের দাবি মেনে নিতে সরকারকে বাধ্য করতে হবে। এর পূর্ব শর্ত হলো জাতীয় ঐক্য। এই দাবি আদায়ের আন্দোলন জোটগত হবে না যুগপৎ হবে সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো অভিন্ন কর্মসূচি ও চিন্তার ঐক্য থাকতে হবে। চূড়ান্ত পর্যায়ে সবাইকে একদফার আন্দোলনে আসতে হবে। তিনি বলেন, এটা প্রমাণিত যে, দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয় না। বর্তমান সরকার নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। তাদের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো প্রশ্নই আসে না। আগামী সংসদ নির্বাচন অবশ্যই কেয়ারটেকার বা দল নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে হতে হবে। কোনো কারণে জাতি যদি এ দাবি আদায়ে ব্যর্থ হয়, তাহলে যে অন্ধকার আমরা দেখছি তার চাইতেও আরো ঘোর অন্ধকার দীর্ঘদিনের জন্য জাতির ঘাড়ে চেপে বসতে পারে।

গত শনিবার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের এক বৈঠকে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের বৈঠকে আমীরে জামায়াত দেশের চলমান পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ একটি কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। একদিকে রাজনৈতিক জুলুম-নিপীড়ন চালিয়ে বিরোধী কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেয়ার সকল ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর উপর সরকার ইতিহাসের কঠিনতম জুলুম চালিয়ে যাচ্ছে। সংগঠন ও এর নেতা-কর্মীদের উপর ভয়াবহ আঘাত এসেছে। এমনকি আমাদের সুধী-শুভাকাক্সক্ষীরাও সরকারের জুলুম-নিপীড়ন থেকে রেহাই পাননি। সরকারের জুলুম-নিপীড়ন মাথায় নিয়েই সংগঠন স্বাভাবিক কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

তিনি বলেন, সরকারের জুলুম-নিপীড়ন ও ষড়যন্ত্রের মধ্যেই ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচন জাতীয়ভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু নির্বাচনকে সামনে রেখে যা ঘটে গেল, তা দেশ ও জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াল। ২০১৮ সালের নির্বাচন একটি ব্যর্থ ও প্রহসনের নির্বাচনে পরিণত হয়। এ জন্য সরকারের ষড়যন্ত্র যেমন দায়ী, তেমনি বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহও এর দায় এড়াতে পারে না। সরকারের ষড়যন্ত্র উপলব্ধি করে তা ব্যর্থ করার দায়িত্ব ছিল বিরোধীদলের। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহ সেই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারেনি বলেই জাতীয় জীবনে মহাসংকট দেখা দিয়েছে।

আমীরে জামায়াত বলেন, অদ্যাবধি জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় দফতরসহ থানা পর্যন্ত কোনো শাখা অফিস খুলতে দেয়া হচ্ছে না। এ অবস্থায় সংগঠনের স্বাভাবিক কর্মকা- পরিচালনা করতে নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। আমাদের অনেক নেতা-কর্মীকে জীবন দিতে হয়েছে এবং সীমাহীন ত্যাগ-কুরবানির নজরানা পেশ করতে হয়েছে। এতদসত্ত্বেও আমরা নানা ঘাত-প্রতিঘাত মাথায় নিয়ে সংগঠনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। দেশ ও জাতির বিপদ-আপদে, দুঃখ-কষ্টে জামায়াতে ইসলামী তার সামর্থ্যানুযায়ী সর্বোচ্চ ভূমিকা পালনের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, স্বাস্থ্যখাতের অব্যবস্থাপনা ও করোনাকালে সরকারের ব্যর্থতা, অর্থপাচার, উলামা-মাশায়েখ ও ইসলামপন্থীদের উপর আঘাত এবং ইসলামী শিক্ষা বিলোপ করার অপচেষ্টাসহ জাতির স্বার্থবিরোধী সকল বিষয়ে আমরা সোচ্চার ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছি এবং সকল বিষয়ে কর্মসূচি পালন করেছি, ভবিষ্যতেও পালিত হবে ইনশাআল্লাহ।

তিনি আরো বলেন, ইতোমধ্যে দেশে ইতিহাসের স্মরণকালের যে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছিল, আলহামদুলিল্লাহ, সকলের আগে বানভাসি মানুষের কষ্ট লাঘবে কাজ করার তাওফীক আল্লাহ পাক সংগঠনের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে সকল শাখাকে দিয়েছিলেন। মহান রবের ইচ্ছায় বানভাসি অসহায় মানুষের পাশে থাকায় জামায়াতের ভূমিকা জাতির সামনে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। জাতির দুর্যোগকালে আরো অনেক দল, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, দেশী-বিদেশী সংস্থা, এনজিও যার যার অবস্থান থেকে ভূমিকা পালন করেছে। তাতে বন্যার্ত মানুষের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, এই বন্যা পরিস্থিতিতে সরকারের ভূমিকা ছিল খুবই নীরব, উদ্বেগ ও হতাশাজনক। সরকার তার দায়িত্ব পালনে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। বন্যার্ত অসহায় মানুষ যখন সহায়-সম্বল হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল, ঠিক সেই সময়ে সরকারের যাবতীয় মনোযোগ ছিল পদ্মাসেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে কীভাবে জমকালো ও চোখ ধাঁধানো উৎসবে পরিণত করা যায় সেদিকে। বানভাসি মানুষের ক্ষেতের ফসল, গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি, বাড়ি-ঘর তাদের চোখের সামনে যখন হারিয়ে যাচ্ছিল, এমন কঠিন পরিস্থিতিতেও প্রথম ৩ দিন সরকারের কোনো খবরই ছিল না। কিন্তু সরকার সমালোচনার মুখে যে কাজটুকু করেছে তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল ও জনগণের সাথে তামাশার শামিল। সম্মানিত প্রধানমন্ত্রী বন্যার্ত এলাকায় হেলিকাপ্টারে এসে মানুষের কষ্ট লাঘবে কোনো আশ্বাস দিয়ে যাননি। এটা জাতির জন্য খুবই দুঃখজনক।

তিনি বলেন, আলহামদুলিল্লাহ জামায়াতে ইসলামী শুরু থেকে এখন পর্যন্ত দুস্থ-মানবতার পাশে রয়েছে। প্রথম দিকে শুকনো খাবার, ফুডপ্যাক, চাল-ডাল-তেল, আলু, রান্নার তৈজসপত্রসহ ধাপে ধাপে বানভাসি মানুষের প্রয়োজন পূরণের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি আমরা ১১৫ টন পশু খাদ্যও সরবরাহ করেছি। তাছাড়া বন্যার্ত এলাকার এসএসসি/দাখিল ও সমমানের পরীক্ষার্থীদেরও আর্থিক সহযোগিতা করা হয়েছে। এখন আমরা পুনর্বাসন কার্যক্রমে হাত দিয়েছি। এটি খুবই কঠিন ও দুঃসাধ্য কাজ। এ জন্য সংগঠনের পক্ষ থেকে ৫ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু এটা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। আল্লাহ যদি এর মধ্যে বারাকাহ দেন, তাহলে বিপন্ন মানুষের কিছুটা হলেও উপকার হবে। কর্মী-শুভাকাক্সক্ষীদের আর্থিক সহায়তায় আমরা যদি ঠিকানা বিহীন মানুষের মাথা গোঁজার একটু ব্যবস্থা করতে পারি, তাহলে মহান আল্লাহ পাকও আমাদের জন্য জান্নাতে এ রকম ব্যবস্থা করবেন বলে আমরা আশা করি। আমরা কর্মী-শুভাকাক্সক্ষীদের কাছ থেকে অনেক সাড়া পেয়েছি এবং এখনও পাচ্ছি। আমাদের কর্মী-শুভাকাক্সক্ষীগণ আর্ত-মানবতার কষ্ট লাঘবে যে ত্যাগ-কুরবানির নজরানা পেশ করেছেন, মহান রব যেন তাদের এ ত্যাগ ও কুরবানি কবুল করেন ও সর্বোত্তম জাযা দান করেন। আল্লাহ তাআলার নিকট দোয়া করি তিনি যেন আমাদের প্রিয় সংগঠন জামায়াতের সকল প্রচেষ্টা কবুল করেন এবং বারাকাহ দান করেন।

আমীরে জামায়াত আরো বলেন, এখন আমরা কর্ম ও সম্বল হারা মানুষের কর্মসংস্থানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। আল্লাহ যেন আমাদেরকে মেহেরবাণী করে আমাদেরকে মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার তাওফীক দান করেন। বন্যা এলাকায় সাধারণত পানি নেমে যাবার পর বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাগ দেখা দেয়। এ জন্য আমরা পূর্ব থেকেই বন্যা পরবর্তী প্রাদুর্ভাব কমানোর জন্য ওষুধের ব্যবস্থা করে রেখেছি, আশা করছি কেউ আক্রান্ত হলে এ থেকে উপকার পাবেন। আমি আবারও মহান রবের নিকট আশা করছি, তিনি যেন আমাদেরকে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ দান করেন, আমীন।

তিনি আরো বলেন, জাতীয় জীবনে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে। এর একটি হলো অর্থনৈতিক সংকট। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য সরকার এটি ধামাচাপা দেবার চেষ্টা করছে এবং উন্নয়নের ফাঁপা বেলুন উড়িয়েই চলেছে। দৃশ্যমান কিছু মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার জাতিকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু জাতি আজ জাগতে শুরু করেছে। মেগা প্রকল্পের নামে প্রকৃত খরচের ৪/৫ গুণ বেশি খরচ করে যে মেগা দুর্নীতি করা হয়েছে, আমাদের আশঙ্কা সেই দুর্নীতির লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। পাচারকৃত টাকার যে হিসাব আমাদের সামনে এসেছে, এটা প্রকৃত হিসাব নয়। অংকটা এতই বড় যে, তা অকল্পনীয়। এটা আমাদের বার্ষিক বাজেটের ৩/৪ গুণেরও বেশি হতে পারে।

তিনি বলেন, সরকার আবারো আজ্ঞাবহ নতুন নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করে নির্বাচনের নামে প্রহসন ও নাটক সাজানোর চেষ্টা করছে। তবে আশার ব্যাপার হলো গত নির্বাচনে যারা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য দল নিরপেক্ষ সরকার গঠনের কথা বলেননি, এবার তারা বলছেন। কিন্তু শুধু বললেই সরকার তাদের এই দাবি মেনে নিবে না। এজন্য অতীতের মতো কঠিন আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে এবং দল নিরপেক্ষ সরকারের দাবি মেনে নিতে সরকারকে বাধ্য করতে হবে। এর পূর্ব শর্ত হলো জাতীয় ঐক্য। এই দাবি আদায়ের আন্দোলন জোটগত হবে না যুগপৎ হবে সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো অভিন্ন কর্মসূচি ও চিন্তার ঐক্য থাকতে হবে। চূড়ান্ত পর্যায়ে সবাইকে একদফার আন্দোলনে আসতে হবে। এটা প্রমাণিত যে, দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয় না। বর্তমান সরকার নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। তাদের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো প্রশ্নই আসে না। তাই আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি আগামী সংসদ নির্বাচন অবশ্যই কেয়ারটেকার বা দল নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে হতে হবে।

আমীরে জামায়াত আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, কোনো কারণে জাতি যদি এ দাবি আদায়ে ব্যর্থ হয়, তাহলে যে অন্ধকার আমরা দেখছি, তার চাইতেও আরো ঘোর অন্ধকার দীর্ঘদিনের জন্য জাতির ঘাড়ে চেপে বসতে পারে। মহান আল্লাহর কাছে এর থেকে আশ্রয় চাই। একটি দায়িত্বশীল জিম্মাদার সংগঠন হিসেবে জামায়াত অতীতে জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এবারো জামায়াতে ইসলামী জাতির এই গুরু দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত রয়েছে। আমাদের কাছে এর কোনো বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য দল নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকারের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে দল-মত-নির্বিশেষে সরকার বিরোধী সকলের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন, মতবিনিময় ও চিন্তার আদান-প্রদান এখনই শুরু করতে হবে। দেশ ও জাতির ঘাড়ে জগদ্দল পাথরের মত জেঁকে বসা সরকারের হাত থেকে মুক্ত করে আগামী দিনে আমাদের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যত বিনির্মাণের সুযোগ দানের জন্য তিনি মহান রবের নিকট তাওফীক কামনা করেন।