চাপ বাড়বে মোংলা বন্দরে, ব্যাপক শিল্পায়নের হাতছানি, বিনিয়োগ বাড়বে ইপিজেডে

নিজস্ব প্রতিবেদকনিজস্ব প্রতিবেদক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  01:17 AM, 25 June 2022
মোংলা বন্দর

স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালুর পর রাজধানী ঢাকার সবচেয়ে কাছের সমুদ্র বন্দর হবে মোংলা বন্দর। রাজধানীর সঙ্গে দূরত্ব কমে যাওয়া ও ফেরি পারাপারের বিড়ম্বনা না থাকায় বন্দরটির ওপর চাপ বাড়বে কয়েক গুণ। ইতোমধ্যে এই বন্দরের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন রাজধানীর গার্মেন্টস মালিক এবং অন্যান্য পণ্য আমদানি-রপ্তানিকারকরা। খুলনার চিংড়ি ও কাঁচা পাট রপ্তানিকারকদের আগের মতো ছুটতে হবে না চট্টগ্রাম বন্দরে। এছাড়া খুলনা, মোংলা ও রামপালে হাতছানি দিচ্ছে ব্যাপক শিল্পায়ন।

রাজধানীর একাধিক ব্যবসায়ী জানান, রাজধানী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের আমদানি-রপ্তানিকারকদের মোংলা বন্দরের প্রতি আগ্রহ কম। কারণ এই জেলাগুলো থেকে মোংলা বন্দরে পণ্য পাঠাতে কিংবা বন্দর থেকে পণ্য নিয়ে যেতে ফেরি পারাপার রয়েছে। এর ফলে তাদের সময়, ব্যয় ও দুর্ভোগ বেড়ে যায়। সেজন্য তারা পণ্য আমদানি-রপ্তানি করেন চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে।

খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি কাজী আমিনুল হক বলেন, পদ্মা সেতু চালুর পর রাজধানীর সঙ্গে মোংলার দূরত্ব কমে যাবে, যোগাযোগ সহজ ও সময় সাশ্রয় হবে। তখন রাজধানীর আমদানি-রপ্তানিকারকরা এই বন্দরের প্রতি আগ্রহী হবে। মোংলা বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানি বাড়বে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি এবং সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, পদ্মা সেতু চালুর পর রাজধানী থেকে চট্টগ্রামের তুলনায় মোংলা বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে সময় ও অর্থ ব্যয় কম হবে। সে কারণে গার্মেন্টস মালিকরা অনেকেই মোংলা বন্দর দিয়ে বিদেশে গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি করবে। তিনি নিজেও রপ্তানির ক্ষেত্রে এই বন্দর ব্যবহার করবেন। বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএ) সভাপতি শেখ সৈয়দ আলী জানান, বর্তমানে তারা অনেক ক্ষেত্রেই কাঁচা পাট চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে বিদেশে রপ্তানি করেন। কিন্তু ফেরিঘাটে সমস্যার কারণে খুলনা থেকে কাঁচা পাট চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। পদ্মা সেতু চালু হলে সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি দুর্ভোগও কমবে। এছাড়া পদ্মা সেতু চালুর পর মোংলা বন্দরে বিদেশি জাহাজ আগমন বাড়লে তখন আর পাট চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠাতে হবে না। মোংলা বন্দরের মাধ্যমেই বিদেশে রপ্তানি করা যাবে।
বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) সহ-সভাপতি হুমায়ূন কবীর জানান, তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে খুলনা থেকে হিমায়িত চিংড়ি চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে বিদেশে রপ্তানি করেন। পদ্মা সেতু চালুর পর চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠাতে আগের বিড়ম্বনাগুলো থাকবে না। এছাড়া মোংলা বন্দরে জাহাজ আগমন বাড়বে। তখন মোংলা বন্দরের মাধ্যমে হিমায়িত চিংড়ি বিদেশে রপ্তানি করা যাবে। মোংলা বন্দর ব্যবহারকারী সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, পদ্মা সেতু চালুর পর মোংলা বন্দর দিয়ে গাড়ি আমদানিও অনেক বেড়ে যাবে।

তবে মোংলা সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত হোসেন বলেন, পদ্মা সেতু চালুর পর মোংলা বন্দরে কর্মব্যস্ততা কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। বন্দর ব্যবহারকারীদের আগ্রহ ধরে রাখতে বন্দরের জেটি ও পশুর চ্যানেল নিয়মিত ড্রেজিং, নির্মাণাধীন খুলনা-মোংলা রেললাইন দ্রুত চালু এবং কাটাখালি থেকে মোংলা বন্দর পর্যন্ত সড়কটি ৬ লেনে উন্নীত করা প্রয়োজন। এদিকে এই বাড়তি চাপ সামাল দেয়ার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। গত ২-৩ বছরে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। ৮টি বড় প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ প্রায় শেষের দিকে।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ মুসা বলেন, বিজিএমইএ নেতাদের সঙ্গে ইতোমধ্যে তার বৈঠক হয়েছে। কয়েকটি বড় পোশাক তৈরিকারক প্রতিষ্ঠান পদ্মা সেতুর চালুর পরপরই পণ্য রপ্তানিতে এই বন্দর ব্যবহারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

তিনি জানান, পদ্মা সেতু চালুর পর মোংলা বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানি যাতে বিঘ্নিত না হয় সেজন্য ইতোমধ্যে ক্রেনসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন করে সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। বন্দরের পশুর নদীর হাড়বাড়িয়া থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত আউটারবার ড্রেজিং সম্পন্ন হয়েছে। জেটি থেকে হাড়বাড়িয়া পর্যন্ত ইনারবার ড্রেজিং চলমান রয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকটি প্রকল্পের কাজ চলছে। নতুন করে জেটি তৈরি করা হচ্ছে। ড্রেজিং সম্পন্ন হলে ৯ মিটার গভীরতার জাহাজ বন্দরের জেটি পর্যন্ত আসতে পারবে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ বাগেরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী ফরিদ উদ্দিন জানান, বন্দরে যাতায়াতের প্রধান সড়কটির সাড়ে ৩০ কিলোমিটার ৬ লেনে উন্নীত করার জন্য ৩ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রকল্পটি বিদেশি দাতা সংস্থার মাধ্যমে করা যায় কিনা সে ব্যাপারে মন্ত্রণালয় চিন্তাভাবনা করছে। কোরিয়ান এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের বৈঠকও হয়েছে।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০২০-২১ অর্থ বছরে মোংলা বন্দরে বিদেশি জাহাজ আসে ৯৭০টি। চলতি অর্থ বছরের মে পর্যন্ত ৮২৮টি জাহাজ এসেছে। শিগগিরই এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হবে বলে তারা আশা করছেন। ২০২০-২১ অর্থবছরে বন্দরটিতে লাভ হয় প্রায় ১৩০ কোটি টাকা।

শিল্পায়নের হাতছানি

পদ্মা সেতু চালুর পর খুলনা, রামপাল ও মোংলায় ব্যাপক শিল্প কারখানা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কাটাখালি তিন রাস্তার মোড় থেকে মোংলা বন্দর পর্যন্ত ৩২ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে প্রায় ২৫-৩০টি শিল্প প্রতিষ্ঠান জমি কিনে ইতোমধ্যে সাইনবোর্ড ঝুলিয়েছে। কেউ জমি কিনে বালু ভরাট করেছে, আবার কেউ অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করেছে।

রামপালের ঝনঝনিয়া মৌজায় ১৫ একর জমি কিনে সাইনবোর্ড ঝুলিয়েছেন খুলনার ফুলতলা উপজেলার দামোদর গ্রামের শিল্পপতি ও আইয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. ফেরদৌস ভূঁইয়া। তার ছেলে ও আইয়ান গ্রুপের পরিচালক মো. জহির উদ্দিন ভূঁইয়া রাজিব জানান, পদ্মা সেতু চালুর পর তারা রামপালের ওই জমিতে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবেন।

রামপালের ভাগা বাজার এলাকায় জমি কিনে খুলনার শিল্পপতি শেখ ফারুক হোসেন ‘ফারুক জুট মিলস লিমিটেড’ নামের সাইনবোর্ড ঝুলিয়েছেন। কাটাখালি থেকে মোংলা বন্দর সড়কের পাশে ভেকটমারি গ্রামে জমি কিনে সাইনবোর্ড ঝুলিয়েছে নূর গ্লোবাল মেটাল রিসাইক্লিং অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। মোংলার দিকে যেতে সড়কের ডান পাশে চোখে পড়ে শীতল ইন্ডাস্ট্রিজ প্রাইভেট লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড।

পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় পরিচালক মো. ইকবাল হোসেন জানান, মোংলায় বর্তমানে ছোট-বড় মোট ১৫৩ টি শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

বাগেরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি লিয়াকত হোসেন বলেন, পদ্মা সেতু চালুর পর কাটাখালি থেকে মোংলা বন্দর পর্যন্ত সড়কের দুই পাশের চিত্র পাল্টে যাবে। বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান যারা আগে থেকে জমি কিনে রেখেছে তারা শিল্প কারখানা তৈরির কাজ শুরু করবে। তিনি বলেন, রামপাল-মোংলায় প্রধান সড়কের পাশের জমির মূল্য অনেক বেড়ে গেছে। মোংলা বন্দর কাছাকাছি হওয়ায় এই সড়কটির পার্শ্ববর্তী শিল্প কারখানার উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে পরিবহন খরচ কম হবে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক প্রণব কুমার রায় বলেন, কাটাখালি থেকে মোংলা বন্দর পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে বিভিন্ন শিল্প গ্রুপ জমি কিনেছে। এখানে শিল্পায়নের সম্ভাবনা খুবই উজ্জল।

বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, পদ্মা সেতু চালু হচ্ছে, খুলনা-মোংলা রেললাইন ও রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ কাজ শেষের পথে। এখন বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য পাইপ লাইনে গ্যাস সরবরাহ এবং রামপালের ফয়লা এলাকায় নির্মাণাধীন বিমানবন্দরের কাজ দ্রুত শেষ করা প্রয়োজন।

মোংলা নাগরিক সমাজের আহবায়ক শেখ মো. নূর আলম বলেন, পদ্মা সেতু চালুর পর রামপাল, মোংলা ও দাকোপে যে শিল্পায়ন বাড়বে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে এই চাপ সামাল দেয়ার জন্য ফরিপুরের ভাঙ্গা থেকে মোংলা বন্দর পর্যন্ত দুই লেনের সড়কটিতে ৬ লেনে উন্নীত করতে হবে।

খুলনা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি কাজী আমিনুল হক বলেন, পদ্মা সেতু চালুর পর খুলনা, মোংলা ও আশপাশের এলাকায় নতুন নতুন শিল্প কারখানা গড়ে উঠবে। ইতোমধ্যে রাজধানীর বেশ কয়েকটি বড় বড় শিল্প গ্রুপ খুলনার রূপসা সেতুর বাইপাস সড়ক, রূপসা সেতুর পূর্ব প্রান্ত থেকে কাটাখালি হয়ে মোংলা বন্দর পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে অনেক জমি কিনে সাইনবোর্ড ঝুলিয়েছে। এসব স্থানে নতুন শিল্প কারখানা গড়ে উঠলে অনেক বেকারের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি খুলনার অর্থনীতি গতিশীল হবে। মোংলা বন্দরের আশপাশে হোটেল-মোটেল গড়ে ওঠারও সম্ভাবনা রয়েছে।

স্থানীয়রা জানায়, মোংলার অপর পাড়ে দাকোপের বানিশান্তা ও আশপাশের এলাকায়ও নতুন নতুন শিল্প কারখানা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া মোংলা পৌর এলাকা থেকে জয়মনি পর্যন্ত পশুর নদীর তীরেও পদ্মা সেতু চালুকে কেন্দ্র করে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। নদীর তীরের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের নামের সাইনবোর্ড দেখা যায়।

বিনিয়োগ বাড়বে ইপিজেডে

পদ্মা সেতু চালুর পর মোংলা ইপিজেডে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা হাতছানি দিচ্ছে। ইপিজেড কর্তৃপক্ষ জানায়, ১৯৯৮ সালে ৩০৩ একর জমিতে এই ইপিজেড গড়ে ওঠে। এখানকার ১৯২টি শিল্প প্লটের মধ্যে ১৮৫টি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, ৭টি বাকি আছে। তবে ইপিজেডে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে মাত্র ৩১টি। এসব কারখানার ৮টি বাংলাদেশি বিনিয়োগকারীদের এবং বাকিগুলো চীন, কোরিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের। চালুর অপেক্ষায় রয়েছে ৩টি এবং কয়েকটির অবকাঠামো নির্মাণ কাজ চলছে।

ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মাহবুব আহমেদ সিদ্দিক জানান, চলতি অর্থবছরে এই ইপিজেডে উৎপাদিত ১ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকার পণ্য বিদেশে রপ্তানি হয়েছে। পদ্মা সেতু চালুর পর এখানে আরও শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হবে, বিনিয়োগ বাড়বে, সেই সঙ্গে রপ্তানি আয়ও বাড়বে। বহু মানুষের কর্মসংস্থান হবে।