চট্টগ্রাম উত্তর ছাত্রলী‌গ ক‌মি‌টির জন্য ২০০ জনের নাম কে‌ন্দ্রে, অর্ধশতাধিকই মাদকাসক্ত বিবাহিত ও অছাত্র!

joybd24joybd24
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  02:53 AM, 17 April 2022

অবশেষে দীর্ঘ ৪ বছর পর কেন্দ্রের কাছে দুই শতাধিক সদস্যের ‘পূর্ণাঙ্গ কমিটি’ জমা দিয়েছে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগ। ২০১৮ সালে এক বছরের জন্য দুই সদস্যের আংশিক কমিটি অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। ৪ বছর পর সেই মেয়াদোত্তীর্ণ আংশিক কমিটির দুই নেতার জমা দেওয়া ‘পূর্ণাঙ্গ’ এই কমিটি নিয়ে অবশ্য অভিযোগের শেষ নেই জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের। একই সঙ্গে সাবেক ছাত্রলীগ নেতারাও বলছেন, একের পর এক অনিয়ম ও বিতর্কের জন্ম দেয়া এই কমিটির বিষয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের ভূমিকায় বিস্মিত তারা। আওয়ামী লীগ নেতাদের এমন অবস্থানের কথা স্বীকার করে নিয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিন এই দুজনের পেছনে রাজনীতি করা কর্মীদের পরিচয় দেওয়ার জন্যই কমিটি অনুমোদনের দিকে এগোচ্ছেন তারা।

গত বুধবার (১৩ এপ্রিল) সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের দপ্তর সেলে এই কমিটি জমা দেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি তানভীর হোসেন তপু ও সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম। কমিটি জমা দিয়ে এর পরদিনই ওমরা হজ পালনের উদ্দেশ্যে দেশত্যাগ করেছেন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি তানভীর হোসেন তপু।

কমিটি জমা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ সভাপতি রেজাউল করিম সুমন।
জমা দেওয়া এই কমিটিতে উপজেলাভিত্তিক হিসেবে সবচেয়ে বেশি নেতা করা হয়েছে হাটহাজারী থেকে ৬০ জন, অন্যদিকে সবচেয়ে কম সদস্য রাখা হয়েছে দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপ থেকে ১৭ জন এবং রাঙ্গুনিয়া থেকে ২২ জন।

জমা দেওয়া এই কমিটিকে ‘একপেশে’ মন্তব্য করে সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা বলছেন, কমিটিতে যোগ্যদের মূল্যায়ন করা হয়নি বরং কেন্দ্রে জমা পড়া এই কমিটিতে অর্ধশতাধিক মাদকাসক্ত, বিবাহিত, অছাত্রসহ বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির নামও রয়েছে। এমনকি বিদেশে শ্রমিক হিসেবে কর্মরত লোকজনের নামও রয়েছে এই তালিকায়।
এই কমিটিকে ‘অযোগ্য’ দাবি করে আওয়ামী লীগ নেতারাও বলছেন, তাদের যা বলার তারা কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের প্রতিনিধিদের জানিয়েছেন। ছাত্রলীগের কমিটিকে ঘিরে যেসব বিতর্ক তাতে তারা অনেকটাই বিরক্ত।

এর আগে গত ১ এপ্রিল পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন ইস্যুতে চট্টগ্রাম নগরীর সিআরবির রেলওয়ে অফিসার্স ক্লাবে সংঘর্ষে জড়ায় জেলা ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের কর্মীরা। এর পরদিন জেলা ছাত্রলীগের সংকট ইস্যুতে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এমএ সালাম ও সাধারণ সম্পাদক শেখ আতাউর রহমান আতার সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতারা।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে ছাত্রলীগের দুই সদস্যের কমিটিকে ব্যর্থ ও অযোগ্য অভিহিত করে ছাত্রলীগের রাজনীতি সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ আংশিক কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে নতুন সম্মেলনের প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেন জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে এমএ সালাম শুরুতে এই বিষয়ে কথা বলতে ‘আগ্রহী নন’ বলে জানান। জেলা ছাত্রলীগের নেতাদের অযোগ্য বলেছেন কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের এই সভাপতি বলেন, ‘একটা কমিটি ৪ বছর ধরে এরা পূর্ণাঙ্গ করতে পারেনি। দফায় দফায় বিতর্কে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। তো এদেরকে কী বলবো?’

এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতাদের সাথে তাদের কী কথা হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সেসব কথা আমলে নিচ্ছে কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে এমএ সালাম বলেন, ‘কেন্দ্রকে যা বলার বলেছি। তারা সেটা আমলে নেবে কিনা, কিংবা না নিলে কেন নেবে না তা তাদেরকে জিজ্ঞাসা করুন।’

এর আগে এই কমিটিকে ‘অযোগ্য ও বিতর্কিত’ দাবি করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কাছে চিঠিও দিয়েছিলেন বিভিন্ন সময়ে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দেওয়া ৬ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক।

তাদের অন্যতম একজন জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রাজিবুল আহসান সুমন বলেন, ‘চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগ অনেক সুশৃঙ্খল আর শক্তিশালী একটা শাখা ছিল। কিন্তু এই কমিটি শুরু থেকেই একতরফা। একতরফা কমিটি হবে জেনে সে সময়ে কর্মীদের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে সম্মেলন পণ্ড হয়েছিল। তারপর তারা দফায় দফায় বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করেছে। টাকার বিনিময়ে উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি অনুমোদন দিয়েছে। এত কিছুর পরেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতারা বিভিন্ন সময়ে এসব বিতর্ক নিয়ে কর্মীদের কথা শুনেছে, আমাদের মতামত নিয়েছে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি। কদিন আগেও কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে সংঘর্ষ হলো। এগুলো খুব বিব্রতকর। রাজনীতির জন্য শুভ নয়। এক্ষেত্রে আমাদের পরামর্শ ছিল এই কমিটি ভেঙে দিয়ে সবাইকে নিয়ে সাংগঠনিকভাবে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করে এই ইউনিটের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হবে।’
জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের বৈঠকে কী আলাপ হয়েছিল— এই বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ সভাপতি রেজাউল করিম সুমন বলেন, ‘উনারা বলতেছিল যে কমিটি তো মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। এটা ভেঙ্গে নতুন করে করা যায় নাকি? এখন অনেকদিন কমিটি পূর্ণাঙ্গ হয়নি। এখন কমিটি পূর্ণাঙ্গ না হলে একটা জেনারেশন পরিচয়হীন থেকে যায়। এজন্য আমাদের ইচ্ছা যে আগে কমিটিটা পূর্ণাঙ্গ হোক। পূর্ণাঙ্গ হলে আমরা যেসব সমস্যা সেগুলো একটা একটা করে সলভ করবো।’

এক্ষেত্রে জমা দেওয়া কমিটিতে প্রায় শতাধিক বিতর্কিত নাম থাকার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সুমন বলেন, ‘আমাদের কাছে অনেকগুলো অভিযোগ আছে। আমরা যাচাই করবো।’

তবে এসব অভিযোগ যাচাইয়ের কোন সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া স্পষ্ট করেনি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। কিভাবে কেউ অভিযোগ করবেন, কোন্ প্রক্রিয়ায় করবেন— এই বিষয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা বা ঘোষণা আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে সুমন বলেন, ‘অনেকেই অভিযোগ জমা দিচ্ছে। তথ্য নেওয়ার তো অনেক জায়গা আমাদের আছে। এক্ষেত্রে বিতর্কিত কেউ থাকলে আমরা বাদ দেব।’

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলন। তুমুল সংঘর্ষে সেই সম্মেলন পণ্ড হলে ৩ মাস পরে একই বছরের ৫ মে দুই সদস্যবিশিষ্ট আংশিক কমিটির অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। এক বছরের জন্য অনুমোদন দেওয়া সেই আংশিক কমিটিতে সভাপতি পদে মিরসরাইয়ের তানভীর হোসেন চৌধুরী তপু এবং সাধারণ সম্পাদক পদে ফটিকছড়ির রেজাউল করিমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।