এবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিক্রির ধারায় যুক্ত হয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও !

জয়‌বি‌ডিজয়‌বি‌ডি
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  05:08 AM, 10 January 2021

করোনায় সৃষ্ট আর্থিক সংকটে কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে অসংখ্য কিন্ডারগার্টেন। আবার কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মালিকানা বদল হয়েছে অর্থের বিনিময়ে। এবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিক্রির এ ধারায় যুক্ত হয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও। সম্প্রতি রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিক্রি করে দিয়েছেন উদ্যোক্তারা। একইভাবে বেচাকেনার প্রক্রিয়ায় রয়েছে বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা আরো কয়েকটি উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয় ট্রাস্টের অধীনে। আইন অনুযায়ী, এসব উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। তবে ট্রাস্ট পুনর্গঠনের সুযোগ রয়েছে। সেটি অবশ্যই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) অনুমোদন সাপেক্ষে হতে হবে। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসিকে অন্ধকারে রেখেই চলছে বিশ্ববিদ্যালয় বেচাকেনা।
আর্থিক সংকটের কারণে সম্প্রতি বিক্রি করে দেয়া উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির নাম প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়। রাজধানীর গুলশানে ভাড়া করা ক্যাম্পাসে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসা বিশ্ববিদ্যালয়টি কিনে নিয়েছে চট্টগ্রামভিত্তিক একটি বড় কনগ্লোমারেট। বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্টি বোর্ডের একাধিক সদস্য বিক্রির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। যদিও তাদের কেউই নাম প্রকাশ করে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
একজন ট্রাস্টি সদস্য বলেন, আইন অনুযায়ী আমাদের স্থায়ী ক্যাম্পাসে চলে যাওয়ার সময় হয়েছে। স্থায়ী ক্যাম্পাস করতে কমপক্ষে একশ থেকে দেড়শ কোটি টাকা প্রয়োজন। এ অর্থের জোগান দেয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এছাড়া করোনার কারণে শিক্ষার্থী ভর্তি ও টিউশন থেকে আয় কমে যাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় চালানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবদিক বিবেচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আবুল খায়ের গ্রুপ বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিচালনা করবে। আশা করি তাদের হাত ধরে এ বিশ্ববিদ্যালয় সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।
কত টাকার বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয় বিক্রি করা হয়েছে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, লেনদেন বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশের সুযোগ নেই। তবে খুব বড় অংকের অর্থ বিনিময় হয়নি।
জানা গেছে, স্থায়ী ক্যাম্পাস করার জন্য কয়েক বছর ধরেই আর্থিক চাপে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্টির বোর্ড। করোনায় সৃষ্ট পরিস্থিতিতে সে আর্থিক সংকট আরো বেশি তীব্র হয়ে ওঠে। আর্থিক সংকট মোকাবেলা করতে না পেরেই সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়টি বিক্রি করে দিয়েছেন ট্রাস্টিরা। প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মূল উদ্যোক্তা ছিলেন চারজন। এরা হলেন রোকেয়া আফজাল রহমান, মোয়াজ্জেম হোসেন, অধ্যাপক মাহবুব আহমেদ ও মো. আমানউল্লাহ। এর মধ্যে তিনজনই ব্যবসায়ী। আরেকজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। এছাড়া তাদের প্রত্যেকের পক্ষে তিনজন করে আরো ১২ জন সদস্য ট্রাস্টি বোর্ডে রয়েছেন।

পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না নিলেও গত মাসে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি অনলাইন সভায় চট্টগ্রামের বড় ব্যবসায়িক গ্রুপটির একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ কয়েকজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তি যোগ দেন। ওই সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিওটি চেয়ারম্যান তাদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাদের পরিচয় করিয়ে দেন। সভায় অংশ নেয়া একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, হঠাৎ করেই অনলাইনের একটি সভায় বিওটি চেয়ারম্যান ব্যবসায়িক গ্রুপটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। পাশাপাশি তাদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় বিক্রি করে দিয়েছেন বলে আমাদের জানান। এখন থেকে নতুন নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হবে বলে ওই সভায় জানানো হয়। এর পর থেকে ওই গ্রুপের কয়েকজন কর্মকর্তা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করছেন।

এদিকে আর্থিক সংকটের কারণে বিক্রির প্রক্রিয়ায় রয়েছে আরো কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যে রাজধানীর বনানীর একটি, উত্তরার একটি, চট্টগ্রামের একটি ও ফরিদপুরের একটি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এছাড়া বিক্রির জন্য ক্রেতা খুঁজছে এমন অন্তত ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে।

করোনা-পরবর্তী সময়ে আরো কিছু বিশ্ববিদ্যালয় বিক্রির আশঙ্কা প্রকাশ করে ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বণিক বার্তাকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডগুলোর দিকে তাকালে খুব বেশি শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিকে সেখানে খুঁজে পাওয়া যাবে না। ব্যবসায়ীরা বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর সেটি নিয়ন্ত্রণের জন্য নিজের পরিবারের সদস্যদের সেখানে অন্তর্ভুক্ত করেন। নিজেদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মতোই বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করেন। অনেকে আবার নামে-বেনামে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনিয়োগ করা অর্থ বা তার চেয়ে বেশি তুলেও নেন। এখন সংকট শুরু হয়েছে, তাই ব্যবসায়ীরা তো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য লস দিতে চাইবেন না। এ জন্যই বিক্রি করে দিচ্ছেন। যদিও আইন অনুযায়ী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিক্রির কোনো সুযোগ নেই।

বর্তমানে দেশে অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ১০৭টি। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সিংহভাগই গড়ে উঠেছে ব্যবসায়ীদের হাত ধরে। গুণগত উচ্চশিক্ষা নয়, বরং ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় খোলার অভিযোগ রয়েছে বণিক শ্রেণীর এসব ট্রাস্টি সদস্যের বিরুদ্ধে। এছাড়া আইনে সুযোগ না থাকলেও বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টিরা সিটিং অ্যালাউন্সসহ নামে-বেনামে বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে আর্থিক সুবিধা নেন। প্রতিষ্ঠাকালে বিনিয়োগ করা অর্থের বিপরীতে কয়েক গুণ লাভ তুলে নেয়ার অভিযোগও রয়েছে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টির বিরুদ্ধে। তবে করোনার কারণে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতোই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়েও বড় ধাক্কা লেগেছে। মাসের পর মাস বেতন পাচ্ছেন না কয়েক ডজন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মকর্তারা। এ দুঃসময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতি বহন করতে রাজি নন ট্রাস্টিরা। তাই অর্থের বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয় বিক্রি করে দিচ্ছেন অন্যের কাছে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থের জোগান দেবেন—এমন শর্তেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পেয়েছিলেন তারা।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সভাপতি শেখ কবির বলেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তেমন কোনো অর্থ আদায় সম্ভব হচ্ছে না। ব্যবসায়ীদের অবস্থা খারাপ থাকায় তারাও বিনিয়োগ করতে পারছেন না।

সরকারের কাছ থেকে ঋণের বিষয়ে আবেদন করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। করোনার এমন পরিপ্রেক্ষিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। এখন কেউ যদি বিশ্ববিদ্যালয় না চালাতে পারে, তাহলে অন্যদের কাছে হস্তান্তর তো করতেই পারে। তবে সেটি ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে।

বিক্রির বিষয়ে কিছুই জানে না শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি: এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখেই বিক্রি হচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। যদিও ইউজিসিসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও কার্যালয়ের মতামতের ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দিয়ে থাকে। প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় বিক্রি বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসিকে কোনো তথ্যই জানানো হয়নি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের নির্দেশনার আলোকে ইউজিসিসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ট্রাস্টের অধীনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয় সরকার। এ সময় ট্রাস্টি সদস্য বিশেষ করে উদ্যোক্তাদের বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে ইতিবাচক প্রতিবেদনকে গুরুত্ব দেয়া হয়। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি যদি সেটি পুনর্গঠন করে, সেটিও অবশ্যই সরকারের অনুমোদিত হতে হবে। না হলে যে কেউই অর্থের বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টে ঢুকে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ বণিক বার্তাকে বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়া হয় ট্রাস্টের অধীনে। সে হিসেবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ব্যক্তিমালিকানা নেই। তাই টাকার বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয় বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। তবে সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে ট্রাস্ট পুনর্গঠনের সুযোগ থাকলেও সেটি অবশ্যই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির অনুমোদন সাপেক্ষে হওয়া বাঞ্ছনীয়। সূত্র: বণিক বার্তা

আপনার মতামত লিখুন :