এক ঝটকায় সবকিছু হারাচ্ছেন সদ্য বহিষ্কৃত তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান।

joybd24joybd24
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  01:31 AM, 09 December 2021

সোশ্যাল মিডিয়ায় অসৌজন্যমূলক বক্তব্য এবং একের পর এক বিতর্কিত ও বেসামাল মন্তব্যের কারণে সদ্য বহিষ্কৃত তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসানকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর তাকে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে বলে জানা গেছে। আপত্তিকর অশালীন বক্তব্যের জন্য দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী শিগগিরই তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে। এর জবাব সন্তোষজনক না হলে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে আওয়ামী লীগ তাকে দল থেকে বহিষ্কার করবে। দলের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এদিকে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো নির্বাচিত এমপি যদি তার দল থেকে বহিষ্কৃত হন, তখন তিনি সংসদ সদস্যপদ হারান। কাজেই মুরাদ হাসান সহসাই সংসদ সদস্যপদও হারাতে পারেন বলেও মনে করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর একজন সদস্য বলেছেন, ডা. মুরাদ যে সব বক্তব্য দিয়েছেন, তা নারীর জন্য অবমাননাকর এবং আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র এবং শৃঙ্খলার পরিপন্থী। এ জন্যই তার বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হচ্ছে। এই কারণ দর্শানো নোটিশ যদি সন্তোষজনক না হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে বহিষ্কারাদেশ আরোপ করা হবে। অন্যদিকে মুরাদ হাসান শুধু দলীয় পদ ও সংসদ সদস্য পদই নন, আওয়ামী লীগ থেকে পুরোপুরি ছিটকে পড়তে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে। খোয়াচ্ছেন নির্বাচনী এলাকা জামালপুরের স্থানীয় জনসাধারণের সঙ্গে দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা সব ধরনের সম্পর্ক।

মুরাদ হাসানকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার খবরে সরিষাবাড়ীতে আওয়ামী লীগসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের আনন্দ মিছিল এবং কুশপুত্তলিকা দাহের ঘটনায় এ আলামত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জামালপুর আওয়ামী লীগের একটি সূত্র জানায়, মুরাদ হাসান মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতা দেখিয়ে দলের ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে ভুঁইফোঁড় ও অরাজনৈতিক লোকজন নিয়ে নিজস্ব বলয় তৈরি করেছেন। যাদেরকে নিয়ে তিনি নতুন করে আওয়ামী লীগকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে ফেলতে পারেন। এ কারণে তারা আগেভাগেই এসব ব্যাপারে সতর্ক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন। তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলে স্থানীয় নেতাকর্মীরা যাতে তার সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্ক না রাখেন সে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কেউ প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে তদন্ত সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধেও দল শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে।

এছাড়া মন্ত্রিত্ব খোয়ানো মুরাদ হাসান বিভিন্ন মামলাতেও ফেঁসে যেতে পারেন বলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন। এতদিন কেউ মুখ না খুললেও এরই মধ্যে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহল থেকে একের পর এক অভিযোগ আসতে শুরু করেছে। নারীর জন্য অবমাননাকর বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ এনে নারীবাদী একাধিক সংগঠন তার বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগেও তার ফেঁসে যাওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মুরাদ হাসানের যেসব ঘটনা এ ক’দিনে ফাঁস হয়েছে, তাতে এ ধরনের আরও অনেক কাহিনী হয়তো ধামাচাপা পড়ে আছে। যা সহসাই একে একে বেরিয়ে আসবে। বিশেষ করে তার দাপটে এতদিন যারা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তারা নানাভাবে তাদের ক্ষোভ মেটানোর চেষ্টা করবেন।

এদিকে সদ্য পদত্যাগপত্র জমা দেওয়া তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসানকে মঙ্গলবার বিকেলে জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পরিবারকল্যাণ সম্পাদকের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট বাকীবিলস্নাহ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির এক সভায় মুরাদকে দলের শৃঙ্খলা পরিপন্থি কাজের জন্য দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জানান, এই সিদ্ধান্তের কপি আওয়ামী লীগ সভাপতির কাছে পাঠানো হবে এবং কার্যনির্বাহী কমিটিতে অনুমোদিত হলে মুরাদ আর আওয়ামী লীগের কেউ থাকবেন না। আর বহিষ্কার হওয়ার পরপরই বহিষ্কারাদেশের কপি স্পিকারের কাছে দেওয়া হলে স্পিকার ডা. মুরাদ হাসানের আসন শূন্য ঘোষণা করবেন।

দায়িত্বশীল একাধিক সূত্রে জানা গেছে, চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) ও একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি থেকেও স্বল্প সময়ের মধ্যেই তাকে বহিষ্কার করা হতে পারে। এ দু’টি সংগঠনের নেতারা এ ব্যাপারে এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছেন। সাংগঠনিক প্রক্রিয়া শেষে শিগগিরই তা কার্যকর করা হবে। বিশেষ গোয়েন্দা বিভাগ এসবি’র একটি সূত্রে জানা গেছে, শিগগিরই মুরাদ হাসানের বিদেশ যাত্রাতে নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। অতীতেও এ ধরনের কার্যকলাপে সম্পৃক্ত জনপ্রতিনিধিদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। কেননা, এসব ঘটনার পর বেশিরভাগ জনপ্রতিনিধি বিদেশে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। এছাড়া যাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ থাকে, তাদেরকে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এজন্য আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশাপাশি স্থলবন্দরসহ সব বহিরাগমন পথে বিশেষ বার্তা দেওয়া হয়। প্রসঙ্গত, বঙ্গবন্ধুর মু্যরাল নির্মাণে বিতর্কিত বক্তব্য দেওয়া কাটাখালী পৌরসভার মেয়র আব্বাস আলীর বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পর তিনি বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে তার উপর গোয়েন্দা নজরদারি থাকায় পুলিশ আগেই তাকে গ্রেপ্তার করে।

গোয়েন্দাদের একটি সূত্র জানায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া ও শামসুন্নাহার হলের নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘কুরুচিপূর্ণ’ মন্তব্য করায় মুরাদ হাসানের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হতে পারে। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে এ ধরনের মামলা করার কোনো প্রস্তুতি নেই। তার এ বক্তব্যে ক্ষতিগ্রস্ত কেউ মামলা করতে পারে। আর এ মামলা হলে ভালোভাবেই ফেঁসে যাবেন মুরাদ হাসান। কেননা, তার এ বক্তব্যের অডিও রেকর্ড সংশ্লিষ্টদের হাতে রয়েছে।

সম্প্রতি গাজীপুরের মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকে দল ও পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রুজু করে ভুক্তভোগীরা। এসব মামলা সামাল দিতে এখন তিনি রীতিমত হিমশিম খাচ্ছেন। এরই মধ্যে তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখা নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা রাখারও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এসব আলামত দেখে ধারণা করা হচ্ছে, মুরাদ হাসানের ভাগ্যেও একই ধরনের ফল ঝুলছে।

প্রসঙ্গত, ডা. মুরাদ হাসান ২০১৪ সালে জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের ‘কার্যকরী সদস্য’ ছিলেন। পরে ২০১৫ সালে জেলার ‘স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদক’ নির্বাচিত হন। এছাড়া তিনি চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) ও একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় সদস্য। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত সরকারে প্রথমে মুরাদ হাসানকে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে ২০১৯ সালের মে মাসে স্বাস্থ্য থেকে তাকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়।