একটি ঘটনা কোনো সাংবাদিক মিস করলে সেটা ফের মঞ্চায়ন করা কতটা নৈতিক?

joybd24joybd24
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  11:53 PM, 21 June 2021

মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের টিকা নেয়ার ভাইরাল ভিডিও সাংবাদিকতায় ঘটনার পুনর্নির্মাণ (re-enactment) নিয়ে বিতর্কটি সামনে নিয়ে এসেছে।

প্রশ্ন উঠেছে একটি ঘটনা কোনো সাংবাদিক মিস করলে সেটা ফের মঞ্চায়ন করা কতটা জরুরি, কতটা নৈতিক? এটা এখন স্পষ্ট যে মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ১৭ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ের ক্লিনিকে সত্যিই করোনার টিকা নিয়েছেন৷ কিন্তু যেসব টেলিভিশন টিকা নেয়ার সময় ফুটেজ বা ছবি পায়নি তাদের অনুরোধে তিনি দ্বিতীয়বার পোজ দিয়েছেন৷ পোজটি ছিল এমন যেন তিনি তখনই টিকা নিচ্ছেন৷ টিকা নেয়ার আসল ভিডিও ভাইরাল না হয়ে পরে ধারণ ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় দেখা দেয় বিপত্তি৷ অনেকেই ভেবে বসেন যে, মন্ত্রী হয়তবা টিকা না দিয়েই টিকার পোজ দিয়েছেন সংবাদ মাধ্যমে৷ আর এটা সামলাতে আসল ভিডিও নতুন করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিয়ে নিজেকে রক্ষা করেন মন্ত্রী৷ সাংবাদিকতায়, বিশেষ করে সম্প্রচার সাংবাদিকতায় এ নিয়ে যে শব্দগুচ্ছ রয়েছে, তা হলো re-enactment৷ বাংলায় বলা যেতে পারে পুনর্নির্মাণ৷ ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে সেটা আবার নতুন করে মঞ্চায়ন৷ এর বাইরেও ফুটেজ বা তথ্য বিনিময়ও বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রচলিত৷ এটা যেমন সাংবাদিকদের মধ্যে হয়, তেমনি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও হয়৷ আর এখন প্রিন্ট মিডিয়ারও অনলাইন আছে৷ আর আলাদা অনলাইন মিডিয়া তো আছেই৷ তারাও টেলিভিশনের মতো ভিডিও ব্যবহার করে৷ এমনকি রেডিওগুলোও এখন হয়ে গেছে ভিজ্যুয়াল রেডিও৷ সব মিলিয়ে সবাই যেন এখন মাল্টিমিডিয়া৷ একুশে টেলিভিশনের ক্যামেরাপার্সন আব্দুর রাজ্জাক ঘটনা ‘পুনর্মঞ্চায়নের’ কারণ জানাতে গিয়ে বলেন, যেমন সচিবালয়ে অধিকাংশ টেলিভিশনের একটি মাত্র টিম কাজ করে৷ একজন ক্যামেরা পার্সন এবং একজন রিপোর্টার৷ ফলে কোনো টেলিভিশনের পক্ষেই এককভাবে সচিবালয়েরর সব ইভেন্ট কাভার করা সম্ভব হয় না৷ দিনে কম করে হলেও চার-পাঁচটি ইভেন্ট ও ব্রিফিং থাকে৷ আবার এমনও হয়, একই সময়ে দুই-তিনটি ইভেন্ট থাকে, ফলে তখন সব টেলিভিশন চ্যানেল মিলে ইভেন্ট ভাগ করে নিয়ে পরে বিনিময় করে৷ এটা একটা রীতি হয়ে গেছে৷ তিনি আরো বলেন, ‘‘এছাড়া প্রয়োজন হলে আমরা অন্য স্টেশন থেকেই ফুটেজ ও তথ্য নিই৷’’ তবে কখনো কখনো কোনো মন্ত্রণালয় সাংবাদিক পাওয়ার জন্য ব্রিফিংয়ের সময় সুবিধামতো সময়ে পরিবর্তনও করে দেয়৷ একাত্তর টেলিভিশনের সিনিয়র রিপোর্টার নাদিয়া শারমিন বলেন, ‘‘এর বাইরেও প্রেস কনফারেন্স বা কোনো সাধারণ ইভেন্ট কেউ মিস করলে সুযোগ থাকলে ফুটেজের জন্য অনুরোধ করেও ওই অনুষ্ঠানের ডামি কিছু শট নেয়ার রীতি আছে৷ আর যারা কথা বলেন তাদের বক্তব্যও নতুন করে নেয়া হয়৷ তবে আমি যখন আলাদা করে বক্তব্য নিই তখন সেটা আলাদাভাবেই বিবেচনা করি৷ এভাবে নতুন প্রতিবেদনের উপাদানও পাওয়া যায়৷’’ তার মতে, ‘‘বাংলাদেশের টেলিভিশন সাংবাদিকতায় এখন এটা একটা প্রচলিত পদ্ধতি৷’’ দৈনিক পত্রিকাও চলছে একই নিয়মে৷ ইত্তেফাকের সিনিয়র রিপোর্টার জামিউল আহসান শিপু বলেন বাড়তি কোনো সুবিধা বা লোকবল না থাকায় ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ পত্রিকার অনলাইন ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে ভিডিও সংগ্রহ করে এবং অনেক ক্ষেত্রেই কোনো অনুমতি বা ক্রেডিট ছাড়াই ওই ফুজেট তারা ব্যবহার করেন৷ ফলে যা হয়, অনলাইনে তথ্য কপি পেস্টের মতো ভিডিও-ও এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে কপি পেস্ট হচ্ছে৷ আর প্রতিবেদকদের কোনো ইভেন্টের জন্য ভিডিও ফুটেজ দিতে হলে তারা নিজেদের মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় করে দেন৷ তবে কোনো কোনো পত্রিকার অনলাইনের জন্য এখন ভিডিও অনেকটা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে৷ দৈনিক দেশ রূপান্তরের অপরাধ বিভাগের প্রধান প্রতিবেদক সারোয়ার আলম জানান, ‘‘আলাদা টিম না থাকায় এটা প্রতিবেদকদেরই করতে হয়৷ ফলে বাড়তি চাপ পড়ে৷ অনেক সময় দেখা যায় প্রতিবেদনের তথ্য আর ভিডিও এক সঙ্গে সংগ্রহ করতে গিয়ে তারা খেই হারিয়ে ফেলেন৷ আর ভিডিওর জন্য আলাদা কোনো আর্থিক সুবিধা ও কারিগরি সুবিধা দেয়া হয় না৷ রিপোর্টারদের তাদের মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে ফোনেই এডিট করে দিতে হয়৷’’ তবে কিছু অনলাইন ও পত্রিকায় সীমিত পরিসরে মোবাইল জার্নালিজমের টিম আছে৷ তবে অনেক বিশ্লেষকের মতে, তাদের বড় একটি অংশের রিপোটিং সেন্স তত ভালো নয়৷ তারা ভিডিও করেন, কিন্তু প্রতিবেদনটি তৈরি করতে হিমশিম খেতে হয়৷ যারা আবার স্ক্রিপ্ট এডিট করেন, তাদের ভিজ্যুয়াল সাংবাদিকতা সম্পর্কে ধারণা নেই বললেই চলে৷ কী ভাবছেন নীতি নির্ধারকরা? সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের সদস্য৷ একই সঙ্গে তিনি গাজী টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক৷ তিনি বলেন, প্রেস কাউন্সিলের সীমাবদ্ধতা হলো ভিজ্যুয়াল মিডিয়ায় কোনো বিচ্যুতি ঘটলে তা তাদের দেখার সুযোগ নেই৷ কারণ, এটা শুধু প্রিন্ট মিডিয়ার জন্য৷ তবে প্রেস কাউন্সিল যাতে সব ধরনের গণমাধ্যম দেখতে পারে সেরকম একটি আইনের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে৷ কিন্তু একটি বেরসরকারি টেলিভিশনের শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে তার পর্যবক্ষেণ রয়েছে৷ তিনি বলেন, শুধু মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীই নয়, আরো অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় সাংবাদিকরা দেরিতে পৌঁছানোর কারণে ফুটেজের জন্য প্রধান অতিথিকে বা গুরুত্বপূর্ণ বক্তাকে আবার বক্তৃতার ভান করতে হয়, নতুন করে বক্তৃতা দিতে হয়৷ ফটোসেশন করতে হয়৷ তার মতে, ‘‘আইনের চেয়ে বড় কথা হলো এটা নৈতিকতার দিক দিয়ে ঠিক নয়৷ যিনি মিস করেছেন, তিনি মিস করেছেন৷ এটা দুই পক্ষেরই দায়িত্ব৷ সাংবাদিকের কাজ হলো সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় পৌঁছানো আর যারা আয়োজক তাদেরও উচিত নয় পরে আবার অভিনয় বা ফটোসেশন করা৷’’ এতে ক্ষতি বা সমস্যা কোথায়? সৈয়দ ইশতিয়াক রেজার মতে, প্রথমত, এটা নৈতিকতাবিরোধী৷ তারপর এটা নানা বিভ্রান্তিও তৈরি করে৷ আবার কখনো দেখা যায়, নতুন করে কথা বলতে গিয়ে মূল বিষয়ের বাইরে কথা বলেন৷ ফলে কৃষি বিষয়ক অনুষ্ঠানে রাজনীতির কথা শোনা যায়৷ টেলিভিশনগুলোর সম্পদের সীমবাদ্ধতা বিবেচনা করে তাই তিনি ফুটেজ বিনিময়কে একটা সমাধান মনে করেন৷ তবে তিনি মনে করেন, তা কার্টেসি দিয়ে হতে হবে৷ নৈতিকতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিউল আলম ভুঁইয়া বলেন, সাংবাদিকতার নীতিমালার দিক দিয়ে দেখলে রি-এন্যাক্টমেন্টের কোনো সুযোগ নেই৷ যদি সম্প্রচার সাংবাদিকতার টেক্সট দেখেন, তাহলে দেখবেন এটা নীতিমালাবিরোধী৷ তিনি বলেন, সম্প্রচার সাংবাদিকের কাজ হলো যথা সময়ে যথা স্থানে উপস্থিত থেকে বিষয়টাকে ধারণ করা, বক্তব্য ধারণ করা, ছবি ধারণ করা৷ মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর ক্ষেত্রে যেটা ঘটেছে বলে শুনেছি, তা হলো, তিনি ভ্যাকসিন নিয়েছেন৷ কিন্ত যারা ফুটেজ পাননি, তাদের অনুরোধে পরে আরেকবার ভ্যাকসিন নেয়ার অভিনয় করেছেন৷ সেখানে তো ক্রেডিবিলিটি, অথেনসিটি নেই৷ দর্শকরা ধোকায় পড়েছেন৷ বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে৷ তার মতে, খবরের জন্য ফুটেজ বিনিময়ও পরিহার করা দরকার৷ যদি এটা চলতে থাকে, তাহলে একাধিক টেলিভিশন চ্যানেল থাকার কী দরকার? দর্শক একাধিক চ্যানেলে তো একই খবর ও ফুটেজ দেখবে৷ তিনি বলেন, ‘‘এটা সাংবাদিকদের সংকট নয়, এটা আসলে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সংকট৷ তারা কম জনশক্তি দিয়ে, কম ক্যামেরা দিয়ে, ধার করে বা রি-এন্যাক্ট করে টেলিভিশন চালাতে চায়৷ ফলে দর্শক বঞ্চিত ও বিভ্রান্ত হয়৷’’ প্রিন্ট বা অনলাইনে টেক্সটের ক্ষেত্রেও তো তথ্য বিনিময়ের ঘটনা ঘটে বা ঘটনাস্থলে না থেকেও তো অন্য মাধ্যমে পরে খবর সংগ্রহ করে৷ সাংবাদিকতার এই অধ্যাপক বলেন, প্রিন্ট বা টেক্সট-এর ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা আছে৷ সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা গেলে তা যে যার ভাষায় লিখতে পারেন৷ কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিক তো আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে তথ্য দিতে পারেন না৷ এটা দেয়া ঠিক না৷ তাহলে তো আর সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্বতা থাকবে না৷ আর এটা পাঠককেও বঞ্চিত করে৷