অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রতারনা থে‌কে মু‌ক্তি পে‌তে করণীয়।

joybd24joybd24
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  11:43 AM, 09 September 2021

দেশে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বছরে এক হাজার কোটি টাকার পণ্য বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন এই খাত সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, বর্তমানে সারাদেশে ৯৫০টি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। এসব সাইটে দৈনিক ৪৫ হাজারের মতো পণ্য বিক্রি হচ্ছে। ই-কর্মাস ব্যবসায়ীদের সংগঠন ই-ক্যাবের তথ্যমতে, বর্তমানে এই প্ল্যাটফর্ম সেবা চালু রেখেছে সাড়ে ৭ শতাধিক অনলাইন শপ। আর ফেসবুকে পেজ খুলে পণ্য বিক্রি করছে আরও ১০ হাজারেরও বেশি প্রতিষ্ঠান। তবে, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণার ঘটনাও। অনলাইন কেনাকাটায় বিভিন্নভাবে প্রতারিত হচ্ছেন গ্রাহক।

চলমান করোনা পরিস্থিতিতে অনলাইন থেকে কেনাকাটা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বহুগুণে বেড়েছে। ফলে ফেসবুককেন্দ্রিক প্রচুর ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, অনলাইনে বিভিন্ন পণ্যের চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে বিক্রেতারা নিম্নমানের পণ্য পাঠিয়ে আবার অনেক সময় প্রকৃত পণ্য না দিয়ে আলু, পটল, পেঁয়াজ বা সাবানের মতো পণ্য পাঠিয়ে প্রতারণা করে গ্রাহকের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

প্রতারণার শিকার রফিকুল ইসলাম এক গ্রাহক তার মেয়ের’র জন্য পোশাক অর্ডার করেন একটি ফেসবুক পেজে। আর বিকাশের মাধ্যমে পরিশোধ করেন পোশাকের অগ্রিম মূল্য। দুই দিনের মধ্যে পোশাকটি তার ঠিকানায় চলে আসার কথা। কিন্তু পাঁচ দিনেও হাতে না পাওয়ায় বিক্রেতার ফ্যাশন হাউজে ফোন করেন তিনি। তারা আজ, কাল বা পরশুর মধ্যে পোশাক পেয়ে যাবেন বলে ঘোরাতে থাকে। তবু পণ্য ডেলিভারি করে না। এক সময় তাদের অফিশিয়াল ফোন নম্বর বন্ধ ও পেজটি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।

অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারণার শিকার আরেকজন শাহিন হোসেন। তিনি একটি স্মার্টঘড়ির অর্ডার দিয়েছিলেন একটি ই-কমার্স থেকে। হাতে পাওয়ার পর দেখলেন স্মার্টঘড়িটি কাজ করে না। ই-কমার্স সাইটে ফোন দেওয়ার পরও তারা কোনো সমাধান দেয়নি।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইনের মাধ্যমে সাশ্রয়ী দামে গ্রাহক পর্যায়ে সরাসরি পণ্য পৌঁছে দিতে দেশে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে ই-কমার্স ব্যবসা। এই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে কিছু কিছু চক্র ভুয়া অনলাইন পেজ খুলে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে, লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। অনলাইনে ক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্য সরবরাহে প্রি-অর্ডারের নামে অগ্রিম টাকা নিয়ে করছে প্রতারণা। আবার অর্ডার নিয়ে সঠিক পণ্যের বদলে দিচ্ছে মানহীন কম দামি পণ্য। ২ দিন, ৭ দিন, ১৪ দিন, ৩০ দিন বা ৪৫ দিনের দিনে পণ্য সরবরাহের কথা বলে ৬ মাসেও ডেলিভারি দেওয়া হয় না। ইতোমধ্যেই ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জসহ বেশকিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে।

এ প্রসঙ্গে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা ই-ক্যাব সভাপতি শমী কায়সার বলেন, ‘অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারণা বন্ধে কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি ও ই-কমার্স আইন প্রয়োজন। কারণ, এটা বড় মার্কেট। চ্যালেঞ্জটা হলো, কিছুটা প্রতারণা হচ্ছে। কিছু প্রতিষ্ঠান নিয়ে অভিযোগ আছে। সময়মতো ও সঠিক পণ্য ক্রেতারা পাচ্ছেন না। তবে এই খাতের জন্য আমরা একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রোসিডিউর (এসওপি) তৈরি করছি। এতে এই খাতের মান বজায় থাকবে বলে আশা করছি। এসওপিতে আমরা বাজারের বিতর্কিত কোম্পানিগুলোকে কালো তালিকাভুক্ত করে তাদের সদস্যপদ স্থগিত করেছি। গ্রাহকদের কাছে অনুরোধ চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে প্রতারিত হবেন না।

অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারণা বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)-এর সিটি সাইবার ক্রাইমের সহকারী পুলিশ কমিশনার চাতক চাকমা বলেন, ‘সম্প্রতি একটি হ্যাকার চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা দেশের অন্যতম চেইন সুপার শপ ‘স্বপ্ন’-এর ডিজিটাল সিস্টেম হ্যাক করে ১৮ লাখ টাকা মূল্যের ডিজিটাল ভাউচারে কয়েকটি ই-কমার্স ইউজারের ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে ২৫% ছাড়ে বিক্রি করে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়। ওই অর্থ তারা বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি অ্যাকাউন্টে জমা করে। তাদের কাছ থেকে জব্দ করা ডিজিটাল ডিভাইস থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকা সমমূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘‘অনলাইনে কেউ প্রতারিত হলে আমাদের জানালে যথাযথ ব্যবস্থা নেই।’

প্রসঙ্গত, কেউ অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারণার শিকার হলে দেওয়ানি ও ফৌজদারি দুই ধরনের মামলা করতে পারে। এই ক্ষেত্রে দেওয়ানি আদালতে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টসহ ক্ষতিপূরণের মামলা করা যেতে পারে। আর ফৌজদারি আদালতে ৪২০ ধারার আওতায় প্রতারণার মামলা করা যেতে পারে; দ্য সেলস অব গুডস অ্যাক্টসের আওতায় প্রতিকার পাওয়া যায়। চুক্তি আইনে প্রতিকার পাওয়া যায়। এমনকি প্রতিটি জেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগ করেও প্রতিকার পাওয়া যেতে পারে।

তবে, বর্তমানে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে অভিযোগ করাটাই সবচেয়ে কার্যকরী পন্থা। অনলাইনে প্রতারিত হলে সংশ্লিষ্ট সাইট বা গ্রুপের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগের সঙ্গে পণ্য কেনার রশিদসহ যাবতীয় তথ্য সংযুক্ত করে ভোক্তা অধিকার কার্যালয়ের ফ্যাক্স বা ই-মেইলে দিতে হবে। ঢাকা ছাড়া অন্য বিভাগের ক্ষেত্রে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক বরাবর অভিযোগ করা যাবে। এ ক্ষেত্রে পণ্য কেনার তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে অভিযোগ জানাতে হবে।